২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ড সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৩০ আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এই প্রেক্ষাপটে তাদের হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন।
শুনানিতে জহিরুল আমিন জানান, এ মামলায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আসামিদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় গিয়েও তাদের হদিস পাননি। এ কারণে তারা আদালতে ‘নন এক্সিকিউটিভ রিপোর্ট’ বা এনইআর দাখিল করেছেন। এই পরিস্থিতিতে পলাতকদের হাজির করতে দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য সময় প্রার্থনা করেন তিনি।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ ৩০ আসামিকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন।
এদিন সকালে এই মামলায় গ্রেফতার ১০ আসামিকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক মন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু।
তবে অসুস্থ থাকায় সাংবাদিক ফারজানা রুপাকে আদালতে হাজির করা হয়নি।
শেখ হাসিনা ছাড়া এ মামলার অন্য পলাতক আসামিরা হলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।
পলাতক পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন- সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও বেনজীর আহমেদ; তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন ও মনিরুল ইসলাম।
অন্যান্য পলাতক কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন- তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর) মো. আনোয়ার হোসেন, ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, এডিসি (মতিঝিল) এস এম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার ও সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ওসি বিএম ফরমান আলী।
শুনানি শেষে প্রসিকিউটর জিএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসামিদের খোঁজা অব্যাহত আছে। আমাদের আইনের বিধান অনুযায়ী, এ পরিস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী ধাপ হিসেবে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি জাতীয় পত্রিকায় নোটিফিকেশন জারি করার আদেশ দিয়েছেন। পলাতক আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য এতে নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কপি ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার দিন ধার্য হয়েছে। এখানে উপস্থিত ১১ জন (ফারজানা রুপাসহ) বাদে বাকি কাউকেই পাওয়া যায়নি। যদি তারা নির্ধারিত সময়ে হাজির না হন, তবে তাদের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী (ডিফেন্স কাউন্সিল) নিয়োগ করা হবে। প্রসিকিউশন তাদের সব নথিপত্র প্রদান করবে এবং সেই ভিত্তিতেই বিচার কাজ চলবে।
এর আগে গত ১৬ আগস্ট ১১ আসামিকে হাজির করার কথা থাকলেও এনইআর রিপোর্ট না আসায় প্রসিকিউশন সময় চেয়েছিল।
গত ২৭ জুলাই ৪১ আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-২।
এ মামলার দুটি অভিযোগের মধ্যে প্রথমটিতে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
আরএনবি/এমআই




