বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পেট চিরে নদীতে লাশ গুম, জিয়াউলের বিরুদ্ধে মাঝির সাক্ষ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

পেট চিরে নদীতে লাশ গুম, জিয়াউলের বিরুদ্ধে মাঝির সাক্ষ্য
পুলিশ পাহারায় আদালতে নেওয়া সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তৎকালীন র‍্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে হাড়হিম করা এক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বরগুনার পাথরঘাটার এক মাঝি।

ওই প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা করেছেন, কীভাবে ২০১০-১১ সালের দিকে ঢাকা থেকে বন্দিদের নিয়ে এসে বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুম করা হতো।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল বুধবার (২ সেপ্টেম্বর)। ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে দশম সাক্ষী হিসেবে আব্বাস মল্লিকের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

এ দিন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে মো. আব্বাস মল্লিক নামের ওই সাক্ষী জানান, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো বাজারে আলোচনা করায় তার ছোট ভাই আলকাছ মল্লিককেও ‘জিয়া স্যার’ ডেকে নেওয়ার পর গুম করা হয়।

সাক্ষ্যপ্রদানকালে ৬০ বছর বয়সি আব্বাস মল্লিক বলেন, ‘২০১০ সালের দিকে র‍্যাব সদস্যরা আমাদের ট্রলারগুলো নিয়ে যেত। সাদা পোশাকে র‍্যাব সদস্যরা এসে বিকেলেই আমাদের বলে যেত সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ রাখতে। রাত ১১টা-১২টার দিকে ঢাকা থেকে হাত-পা ও চোখ বাঁধা বন্দিদের মাইক্রোবাসে করে আনা হতো।’

আব্বাস মল্লিক আদালতকে জানান, বন্দিদের ট্রলারে তোলার পর হোগলা, রশি ও সিমেন্টের বস্তা নেওয়া হতো। তিনি বলেন, ‘বলেশ্বর নদীর মাঝখানে যাওয়ার পর জিয়া স্যার (জিয়াউল হাসান) নিজে বন্দিদের মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন। গুলি করার পর মৃত বন্দির পেট চিরে ফেলা হতো যাতে লাশ ভেসে না ওঠে। এরপর গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।’

তিনি আরও জানান, ট্রলারের খোন্দা (পাটাতনের নিচ) থেকে বন্দিদের বের করে ‘সাপোর্টে’ বসিয়ে গুলি করা হতো। অপারেশন শেষে ট্রলারগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করতে হতো।

কেন ধুতে হতো—তার বর্ণনায় আব্বাস মল্লিক বলেন, ‘বন্দিদের পেট কাটার ফলে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসত, মগজ ছিটকে ট্রলারে লেগে থাকত এবং রক্তে বোট ভেসে যেত। কাজ শেষে জিয়া স্যার আমাদের খামে করে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা দিতেন।’

সাক্ষীর ভাষ্যমতে, কিছু বন্দিকে নদীতে মারা হলেও বাকিদের নিয়ে যাওয়া হতো সুন্দরবনে। সেখানে বোট থামিয়ে বন্দিদের নামিয়ে ‘নাটক সাজিয়ে’ হত্যা করা হতো। এরপর সাংবাদিকদের ডেকে এনে সেগুলোকে জলদস্যুদের সাথে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হতো।

ভাই আলকাছ মল্লিককে গুমের অভিযোগ

আব্বাস মল্লিকের ছোট ভাই আলকাছ মল্লিক ছিলেন ওই ট্রলারগুলোর মালিক। র‍্যাবের এই নৃশংসতার কথা আলকাছ বাজারে আলোচনা করায় তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল বাহিনীটি। সাক্ষী জানান, ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘জিয়া স্যার দেখা করতে বলেছেন’ বলে ফোন পাওয়ার পর আলকাছ বাড়ি থেকে বের হন এবং এরপর আর ফেরেননি।

তিনি বলেন, ‘আমরা র‍্যাবের বিভিন্ন দপ্তরে খুঁজেও ভাইকে পাইনি। থানায় জিডি করতে গেলেও পুলিশ জিয়া স্যার বা র‍্যাবের নাম লিখতে দেয়নি। আমি আজ ট্রাইব্যুনালে আমার ভাইয়ের নিখোঁজের বিচার চাই।’

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাক্ষী আব্বাস মল্লিক আজ ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল হাসানের উপস্থিতিতেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চাক্ষুষ বর্ণনা দিয়েছেন। কীভাবে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মানুষকে হত্যা করে প্রমাণ মুছে ফেলা হতো, তার বিস্তারিত উঠে এসেছে।’

প্রসিকিউটর আরও জানান, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এই মামলাগুলোর তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। জিয়াউল হাসান ছাড়াও সিটিটিসি ও র‍্যাবের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আসা গুমের অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন শিগগিরই হাতে পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিন শুনানির সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও র‍্যাবের তৎকালীন নীতি-নির্ধারক পর্যায়ে থাকা জিয়াউল হাসান।

জবানবন্দি শেষে আব্বাসকে জেরা করেন জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও তাসমিরুল ইসলাম। 

আরএনবি/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর