মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

City Bank CityTouch

বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট
ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের মতো গুরুতর শাস্তি প্রদান করতে হলে তা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’ কর্তৃক পরীক্ষিত হতে হবে। 

বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার আগে কোনোভাবেই গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

অসদাচরণের অভিযোগে এক কলেজ শিক্ষকের বরখাস্তের সিদ্ধান্তে বোর্ডের অনাপত্তি চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারিকৃত রুল খারিজ করে এই রায় প্রদান করা হয়েছে।

রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, বেসরকারি কলেজের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রবিধানমালা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো শিক্ষককে কারণ দর্শানোর যথোপযুক্ত সুযোগ না দিয়ে বা কেবল মৌখিক বা মুঠোফোনের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে তড়িঘড়ি করে বরখাস্ত করা সম্পূর্ণ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং বেআইনি।

‘মোহা. আখতারুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ মামলায় এই যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। গত ৭ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী এবং বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় দেন। ৩০ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবির।

রায় ঘোষণাকালে আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. কামরুজ্জামান। সংশ্লিষ্ট কলেজ শিক্ষকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জহিরুল ইসলাম। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতান মাহমুদ বান্না।

রায়ে আদালত কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না-মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে তাকে বকেয়া বেতন-ভাতা প্রদান ও অবসরোত্তর সুবিধা প্রদানের নির্দেশ সংক্রান্ত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র সিদ্ধান্তকে বহাল রাখা হয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে অনৈতিক বা অসদাচরণের একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগে বলা হয়, শিক্ষক আবুল মনসুর ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টায় জাকিয়া বেগমের বাড়িতে যান। প্রথমে তিনি মেয়ের একটি বই ফেরত দেওয়ার কথা বলে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে অসৎ উদ্দেশ্যে পুনরায় ফিরে এসে ছোট মেয়ের পাশে বসেন এবং তার মাথায় ও হাতে স্পর্শ করেন। তিনি তৃতীয়বারও বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে কলেজের অধ্যক্ষ ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর শিক্ষক আবুল মনসুরকে শোকজ নোটিশ দেন। তবে আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ওই নোটিশে অভিযোগের তারিখ হিসেবে ৭ নভেম্বর উল্লেখ করা হয় এবং তিন দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। শিক্ষক পরদিন জবাব দিয়ে বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন।

শিক্ষকের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গভর্নিং বডি ২৯ নভেম্বর পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন সংবলিত দ্বিতীয় শোকজ নোটিশ দেয়। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মুঠোফোনের নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি নিয়মবহির্ভূতভাবে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ওই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যকর দেখানো হয়।

পরবর্তীতে অনুমোদনের জন্য এই সিদ্ধান্ত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে পাঠানো হয়। ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় কমিটি গভর্নিং বডির প্রস্তাবটি নামঞ্জুর করে এবং শিক্ষককে সব বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। ২৮ মে এক মেমোর মাধ্যমে কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করলেও বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত বিধান নেই।

এরপর বোর্ডের ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে 

হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।

চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনা

চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করার পাশাপাশি আগের দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করেন। তবে মামলাটি দীর্ঘ সময় বিচারাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ইতোমধ্যে অবসরগ্রহণের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে গেছেন। ফলে তাকে সরাসরি আগের পদে পুনর্বহালের আর সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।

আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, পুনর্বহালের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক তার বরখাস্তের তারিখ থেকে শুরু করে অবসরে যাওয়ার তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্য সমস্ত বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিসংক্রান্ত যাবতীয় সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী হবেন। শিক্ষাবোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ে আদালত পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ব্যতীত কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত করা যায় না। গচিহাটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার আগেই নিজ থেকে বরখাস্ত কার্যকর করে আইনি এখতিয়ারকে অগ্রাহ্য করেছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

আরএনবি/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর