বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ২০১৫ সালে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ব্যক্তিকে হত্যার নেপথ্যে তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রভাবের কথা জানিয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন এক পুলিশ পরিদর্শক।
সোমবার (৩১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দেওয়া জবানবন্দিতে মো. আলী আহম্মেদ দাবি করেছেন, এসপির নির্দেশে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট দুই পুলিশ সদস্যকে ২৫ হাজার টাকা করে পুরস্কারও দেওয়া হয়েছিল। তিনি তৎকালীন সময়ে উজিরপুর থানার সেকেন্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে জবানবন্দিতে জানান।
আলী আহম্মেদ জানান, ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে তৎকালীন জেলা এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ উজিরপুর থানায় আসেন। সেখানে তিনি তৎকালীন ওসি নুরুল ইসলামের কক্ষে প্রায় ১৫ মিনিট কথা বলে চলে যান।
এরপর ওসির নির্দেশে এএসআই জসিম উদ্দিন এবং এএসআই মাহাবুলকে একটি বিশেষ অভিযানের জন্য কমান্ড সার্টিফিকেট (সিসি) দেওয়া হয়। ওসির নির্দেশনা ছিল, তারা এসপির তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
জবানবন্দিতে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পরদিন সকালে টেলিভিশনের হেডলাইনে দেখি পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়া এলাকায় টিপু হাওলাদার এবং কবির মোল্লা নামে দুইজন লোক পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ওইদিন বিকেলে থানায় গেলে ওসি সাহেব আমাকে নির্দেশ দেন, ওই দুই এএসআইকে যেন আগামী ১০ দিন কোনো ডিউটি না দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ওই দুই এএসআইয়ের ছুটি আরও বাড়ানো হয়েছিল উল্লেখ করে আলী আহম্মেদ বলেন, থানার অফিসার ও ফোর্সদের মধ্যে কানাঘুষা ছিল যে আগৈলঝাড়ার ক্রসফায়ারের ঘটনা এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিম ঘটিয়েছে। পরে জানতে পারি, এসপি সাহেবের নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানেই এটি হয়েছে। এমনকি এই কাজের জন্য তাদের ২৫ হাজার টাকা করে পুরস্কৃত করা হয়েছে বলেও আমি শুনেছি।
তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে জবানবন্দিতে বলা হয়, ওই দুই এএসআই অত্যন্ত বেপরোয়া ছিলেন। তারা ডিউটি না করে তৎকালীন এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং এসপির রেফারেন্স দিতেন। তাদের ভয়ে অন্য পুলিশ সদস্যরাও তটস্থ থাকতেন।
আলী আহম্মেদ তার জবানবন্দিতে আরও দাবি করেন, তৎকালীন সরকারের আমলে বরিশাল জেলায় আরও বেশ কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি এই তথ্যগুলো প্রদান করেন।
২০১৫ সালে উজিরপুর থানায় সেকেন্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকা এই কর্মকর্তা বর্তমানে বরিশাল মেট্রোপলিটনের সিআইডিতে কর্মরত আছেন।
এই মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনকে এদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার প্রধান দুই আসামি সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং সাবেক এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের শিকার দুইজন হলেন—আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং উপজেলা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়, টিপু ও কবির ছিলেন সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের সরিয়ে দিতে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তৎকালীন এসপিকে নির্দেশ দেন। ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাদের গ্রেপ্তারের পর রাতে আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়।
এর আগে গত ২০ মে চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
আরএনবি/এআর




