ফেনীর আলোচিত সোনাগাজী ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের রায় আজ সোমবার ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং তাদের সাজা বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
এর আগে শুনানি শেষে গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। গুরুতর দগ্ধ নুসরাত ৯ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
হত্যাকাণ্ডের সাত মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। পরে আসামিপক্ষ সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও সংশ্লিষ্ট বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য ২০২৬ সালের ১০ জুন হাইকোর্টের এ বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। ১৪ জুন বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়। সাত বছর আগের এ হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ২৮ জুলাই। টানা ১৭ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত বৃহস্পতিবার রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও মুহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফুল আলম ও মাহবুবা তাসনিম আখি।
আদালতের আদেশের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির বলেন, ১৬ আসামির আইনজীবীরা বক্তব্য উপস্থাপনের পর গত বুধবার প্রথমার্ধে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এরপর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে রাষ্ট্রপক্ষ চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া শুরু করে, যা বৃহস্পতিবার শেষ হয়।
তিনি বলেন, এখন ন্যায়বিচারের দায়ভার আদালতের ওপর। আসামিপক্ষ এ দেশের নাগরিক, ভিকটিমও এ দেশের নাগরিক। আমরা চাই না কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা হোক।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে তাকে সাজা দেওয়া ঠিক নয়।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ৬ এপ্রিল নুসরাতকে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে অধ্যক্ষের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ৯ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন, মহিউদ্দিন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম।
এদিকে নুসরাতের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তৎকালীন সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে আট বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন ট্রাইব্যুনাল। এটি বাংলাদেশের প্রথম সাইবার ট্রাইব্যুনালে প্রকাশিত রায়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী ও স্বজনদের দাবি, নুসরাত মাদরাসার ছাদে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাদের অভিযোগ, পিবিআই ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করে নিরীহ ব্যক্তিদের মামলায় ফাঁসিয়েছেন এবং একটি আত্মহত্যার ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। হাইকোর্টে আপিল করা আসামিদের পক্ষে আদালতে উপস্থাপিত নথিপত্র ও যুক্তি বিবেচনায় তারা খালাস পাবেন বলে আশা করছেন।
অন্যদিকে মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে মামলাটি রায় পর্যন্ত পৌঁছেছে। গভীর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের ফেনীর আদালতে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, উচ্চ আদালতেও ফাঁসির দণ্ড বহাল থাকবে।
প্রতিনিধি/এএস




