সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

আবুল কালামের আপিল চলবে কি না, জানা যাবে ৩১ আগস্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

আবুল কালামের আপিল চলবে কি না, শুনানি পিছিয়ে ৩১ আগস্ট
ছবিতে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত আবুল কালাম আযাদ

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন মাওলানা আবুল কালাম আযাদের করা আপিল গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ৩১ আগস্ট দিন ঠিক করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

একইসঙ্গে তার মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিতের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ বা পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের আবেদনের বিষয়েও সেদিন শুনানি হবে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই দিন নির্ধারণ করেন।

আদালতে আজ আপিলকারীর পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

শুনানি শেষে আবুল কালাম আযাদের আইনজীবী নাজিবুর রহমান মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফ্যাসিবাদের আমলে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সেই ট্রাইব্যুনালের জাজমেন্টের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের স্পেসিফিক অবজারভেশন আছে যে— একে ‘ট্র্যাভেস্টি অব জাস্টিস’ (বিচারের নামে প্রহসন) ও ‘মিসক্যারেজ অব জাস্টিস’ (বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা) বলা হয়েছে। মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ডটি ইন অ্যাবসেন্টশিয়া (অনুপস্থিতিতে) দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল সেই প্রহসনের একটি নজির।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিপ্লবের (জুলাই আন্দোলন) পরবর্তীতে তিনি যখন দেশে ফিরে আসেন, নিয়ম অনুযায়ী সিআরপিসির ৪০১ ধারা মতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে সাজা স্থগিতের আবেদন করেন। গত বছরের ২২ অক্টোবর এক বছরের শর্তে সেই আবেদন মঞ্জুর করা হয় এবং বলা হয় এই সময়ের মধ্যে আপিল করতে হবে। সেই অনুযায়ী আমরা সারেন্ডার করে আপিল করেছি।’

স্থগিতাদেশের মেয়াদ নিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘আপিল শুনানি দীর্ঘদিন ধরে না হওয়ায় আগামী ২২ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপর কী হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। যেহেতু এটি ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট (মৃত্যুদণ্ড), তাই আমরা স্থগিতাদেশ বাড়ানোর আবেদন করেছিলাম। আদালত আজ বললেন, ৩১ আগস্টের মধ্যেই তারা আপিলটি শুনে ফেলবেন।’

শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী মোমেন বলেন, ‘এখানে ন্যায়বিচারই মুখ্য। কে বেনিফিট (সুবিধা) পাবে সেটা বড় বিষয় নয়। মাওলানা আযাদের ওপর ইনজাস্টিস (অবিচার) হয়েছে, সেই সময় এটি একটি ‘ক্যাঙ্গারু ট্রায়াল’ ছিল। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার করা হোক, সেটা আমরা চাই। তবে আযাদের কেসটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।’

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এই আপিলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, ‘মাওলানা আবুল কালাম আযাদ দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে তিনি সাজা স্থগিতের আবেদন করেন এবং সরকার এক বছরের জন্য তা স্থগিত করে। সেই আদেশের বলে তিনি আপিল করেছেন। কিন্তু আমরা আজ এর বিরোধিতা করেছি।’

আমিনুল ইসলাম আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর ২১(৩) ধারা মতে, ৩০ দিনের পরে কোনো আপিল দায়ের করা যায় না। এই আপিলটি আইনত ‘বার্ড বাই লিমিটেশন’ (মেয়াদোত্তীর্ণ)। তারা সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের নীতিতে ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ চাইছেন, কিন্তু যেখানে সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ আইন আছে, সেখানে ১০৪ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয় না।’

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘নির্বাহী আদেশ আমাদের আইনের ওপরে প্রাধান্য পেতে পারে না। তারা আদালতের অনুমতি বা ‘লিভ টু আপিল’ না নিয়ে সরাসরি আপিল করেছেন, যার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। আদালত আপাতত সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়াননি, বরং আপিলটি রক্ষণীয় কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত শুনানির জন্য ৩১ আগস্ট তারিখ দিন ধার্য করেছেন।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তবে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি রায় ঘোষণার সময় আবুল কালাম আযাদ বিদেশে পলাতক থাকায় তিনি আপিল করতে পারেননি।

আবুল কালাম আযাদ নির্ধারিত সময়ের ১৩ বছর পর আপিল করার সুযোগ পেয়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর সেটিই ছিল ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়।

সেসময় ফরিদপুরের বাসিন্দা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে ১৪ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে হত্যা, দুই নারীকে ধর্ষণ, অপহরণ ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। 

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের মার্চে পাকিস্তান হয়ে আযাদের দেশে ফেরার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর সাজা স্থগিত চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তিনি।

সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২২ অক্টোবর তার দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তখনকার অন্তর্র্বতী সরকার। তবে শর্ত দেওয়া হয়, আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাকে আপিল দায়ের করতে হবে।

এরপর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে আপিল প্রস্তুতের জন্য রায়ের সার্টিফায়েড কপি (নকল) ও অন্যান্য নথিপত্র চেয়ে আবেদন করেন আবুল কালাম আযাদ।

ট্রাইব্যুনাল শুরুতে তাকে কারাগারে পাঠানোর মৌখিক আদেশ দিলেও পরবর্তীতে স্থগিতাদেশ বিবেচনায় মুক্ত অবস্থায় থাকার অনুমতি দেন। পরে তিনি আপিলও দায়ের করেন।

আরএনবি/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর