রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘মোনালিসাকে নিয়ে এসো’: ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘরে বন্দিদের কোডনাম রহস্য

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

‘মোনালিসাকে নিয়ে এসো’: ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘরে বন্দিদের কোডনাম রহস্য
ঢাকা সেনানিবাসস্থ ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের আয়নাঘরের চিত্র। ছবি- সংগৃহীত

ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) বা আয়নাঘরে বন্দিদের ওপর  নির্যাতনের পাশাপাশি বজায় রাখা হতো চূড়ান্ত গোপনীয়তা। সেখানে বন্দিদের রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নয়, বরং ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোনো বন্দিকে ডাকার প্রয়োজন হলে কর্মকর্তারা সংকেত দিয়ে বলতেন- ‘মোনালিসাকে নিয়ে এসো।’ আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে বলপূর্বক গুম ও নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এই জেআইসি সম্পর্কে প্রসিকিউশনের তদন্তে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

গত শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের ভেতরে গোপন বন্দিশালা বা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানসহ বিচারকরা। এদিন সকালে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এই বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।

Joint_Interrogation_Cell_3
ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের আয়নাঘরের চিত্র। ছবি- সংগৃহীত

আর্ট গ্যালারি ও কোডনেম রহস্য

প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, গোপন বন্দিশালাকে আড়াল করতে এক অদ্ভুত পরিভাষা ব্যবহার করত ডিজিএফআই। স্থাপনাটির নাম জেআইসি হলেও কর্মকর্তাদের কাছে এটি ‘আর্ট গ্যালারি’ নামে পরিচিত ছিল। বন্দিদের পরিচয় গোপন রাখতে তাদের দেওয়া হতো বিভিন্ন বিখ্যাত শিল্পকর্মের কোডনেম।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো নির্দিষ্ট বন্দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যখন কক্ষ থেকে বের করার নির্দেশ দেওয়া হতো, তখন সরাসরি নাম না বলে ‘মোনালিসা’ বা অন্য কোনো শিল্পকর্মের নামে তাকে ডাকা হতো।

বিগত সরকারের সময়ে জেআইসিতে ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এটি মূলত মানুষকে ধরে এনে অত্যাচার ও নির্যাতন চালানোর একটি সেল ছিল, যা পরে আয়নাঘর হিসেবে পরিচিতি পায়। এই বন্দিশালার কক্ষগুলো ছিল সাউন্ডপ্রুফ এবং জানালা-দরজাবিহীন অন্ধকার প্রকোষ্ঠ।’

ঢাকা সেনানিবাসের কাফরুল থানাধীন এলাকায় ডিজিএফআই সদর দপ্তরের দক্ষিণ পাশে এবং মেস-বি সংলগ্ন একটি দোতলা ভবনে এই জেআইসি অবস্থিত। ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো সরাসরি এটি পরিচালনা করত। এমওডিসি (মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্স কনস্ট্যাবুল্যারি বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বাহিনী) ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা এই স্থাপনার নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

Joint_Interrogation_Cell_4
ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের আয়নাঘরের চিত্র। ছবি- সংগৃহীত

আয়নাঘরের বর্ণনা দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল বলেন, ‘সেখানে ভারী এক্সজস্ট ফ্যান লাগানো ছিল, যাতে বন্দিদের কান্নার শব্দ বাইরে যেতে না পারে। এখানে ব্রিগেডিয়ার আযমীসহ অনেককে দিনের পর দিন অমানবিকভাবে আটকে রাখা হয়েছিল।’

দীর্ঘদিন পরিবার ও আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করে আটকে রাখাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা মানুষকে যখন আপনি দিনের পর দিন বন্দি করে রাখবেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবেন, আইনের সহায়তা লাভ থেকে বঞ্চিত করবেন, এটা সবটাই কিন্তু ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি (মানবতাবিরোধী অপরাধ)।’

অন্ধকার সেল ও সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ

ডিজিএসআই কমপ্লেক্স ভবনের নিচতলায় দুটি অংশে বিভক্ত এই বন্দিশালায় ছোট-বড় মোট ২৬টি স্থায়ী সেল ছিল। তদন্তকালে দেখা গেছে, সেগুলোর দেয়াল ছিল এব্রো-থেব্রো (উচু-নিচু) সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া। অধিকাংশ সেলে কোনো জানালা ছিল না, ছিল কেবল এক্সস্ট ফ্যান (ভেন্টিলেটর ফ্যান)। দরজায় লোহার শিকের ওপর ভারী কাঠের পাল্লা লাগানো ছিল, যাতে ভেতর থেকে বাইরের কিছু দেখা না যায়। এছাড়াও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছিল দুটি বিশেষ সাউন্ডপ্রুফ (শব্দনিরোধক) কক্ষ, যা নির্যাতনের সবরকম সরঞ্জামে সজ্জিত ছিল।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, জেআইসিতে ২৬টি এবং টিএফআইতে ২৯টি কক্ষ ছিল। এর বাইরে র‍্যাব-২ এর দপ্তরে আরও একটি আয়নাঘর বা গোপন বন্দিশালা ছিল, যেখানে নির্যাতনের জন্য ইলেকট্রিক চেয়ার বসানো হয়েছিল। এছাড়া গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবির টিএফআই সেলটিও সিলগালা করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পরিদর্শন করা হবে।

প্রসিকিউশনের তদন্তে উঠে এসেছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই আয়নাঘরের চিহ্ন মুছে ফেলার ব্যাপক চেষ্টা চালানো হয়েছে। বন্দিশালার দেয়াল, দরজা এবং সামগ্রিক কাঠামো পরিবর্তন করে গুম ও নির্যাতনের অনেক সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে। বর্তমানে ভবনটির বাইরে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য ‘করোনা আইসোলেশন সেন্টার’ নামে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমানের মতো ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় এই স্থাপনাটি আয়নাঘর হিসেবে পরিচিতি পায়।

Joint_Interrogation_Cell
ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের আয়নাঘরের চিত্র। ছবি- সংগৃহীত

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল বলেন, ‘সেখানে বন্দি থাকা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর নিজ হাতে লেখা ‘HQ3’ প্রতীকী চিহ্নটি সাদা রং করে প্লাস্টার করে দেওয়া হলেও তা এখনো একটি কক্ষে বিদ্যমান। জেআইসি ও টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন-টিএফআই সেলে পাওয়া এসব আলামত সিলগালা করে প্রসিকিউশনের হেফাজতে রাখা হয়েছে।’

আসামিপক্ষের আপত্তি ও পাল্টা দাবি

তবে আয়নাঘর বা গোপন বন্দিশালায় গুম ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের জেআইসি পরিদর্শনের সময় নিয়ে আপত্তি তুলেছে আসামিপক্ষ। তাদের দাবি, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার আগে এই পরিদর্শন আসামিদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিদর্শন শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু দাবি করেন, ভুক্তভোগী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা আমান আজমী একজন ‘মিথ্যাবাদী’ সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘আজমীর সাক্ষ্য এবং আজকের বাস্তব চিত্র মেলালে তিনি একজন মিথ্যাবাদী সাক্ষী হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। মি. আজমী জবানবন্দিতে বলেছিলেন তিনি সেখানে থাকাকালীন আলো, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য বা গাছপালা কিছুই দেখেননি। অথচ আজকে ওনার ব্যবহৃত ১৭ ফিট বাই ২১ ফিটের যে এসি রুমটি আমাদের দেখানো হলো- সেখানে দক্ষিণ দিকে দুটো জানালা আছে। সেই জানালা দিয়ে অন্তত ২০ বছরের পুরনো বড় গাছ দেখা যায়। যে ব্যক্তি গাছ দেখেনি, সে মেস-বির উল্টা দেয়াল দেখলো কীভাবে?’

আন্তর্জাতিক আদালতের নজির টেনে এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘রুয়ান্ডা এবং যুগোস্লাভিয়ার উদাহরণে বিচারকরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন সকল সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর। আগে পরিদর্শনে গেলে সাক্ষ্য গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আমরা এই বিষয়টি আগামীতে উচ্চ আদালতে তুলব।’

Joint_Interrogation_Cell_2
ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের আয়নাঘরের চিত্র। ছবি- সংগৃহীত

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুর মিসবাহ বলেন, ‘জেআইসি একটি ফ্যাসিলিটি মাত্র। জেল সুপার যেমন ঠিক করেন না কাকে আনা হবে বা ছাড়া হবে, ওনাদেরও তেমন কোনো ব্যক্তিগত দায় নেই।’

অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী মাহিন এম রহমান বলেন, ‘জেআইসি নব্বইয়ের দশকে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। প্রসিকিউশন মূল অপরাধীদের খুঁজে না পেয়ে আমাদের এই তিন জেনারেলকে ‘স্কেপগোট (বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা করছে।’

তবে আসামিপক্ষের এসব বক্তব্যের সমালোচনা করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনা যখন যেমন মন চায় কথা বলেন; তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের ডিফেন্সের বন্ধুরাও একই ভাষায় বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছেন।’

গত ১ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় র‍্যাব-১ কার্যালয়ে  টাস্ক ফোর্সেস ইন্টারোগেশন (টিএফআই) নামে পরিচিত টর্চার সেল পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও প্রসিকিউটররা। এটি ‘হাসপাতাল’ ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়। সেদিনও বিচারক, প্রসিকিউশন টিম, ভিকটিম পরিবারের সদস্য এবং মানবাধিকার কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

আরএনবি/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর