আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি, প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) কমপ্লেক্সে অবস্থিত বহুল আলোচিত ‘গোপন বন্দিশালা’ বা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) পরিদর্শন করেছেন।
পরিদর্শন শেষে আসামিপক্ষের এক আইনজীবী দাবি করেছেন, ভুক্তভোগী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা আমান আজমী একজন ‘মিথ্যাবাদী’ সাক্ষী।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এই বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, বিচারকের সঙ্গে প্রসিকিউশন এবং আমরা ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবীরা জেআইসি নামে ডিজিএফআইয়ের যে বন্দিশালা পরিদর্শন করেছি, সেখানে আজমীর সাক্ষ্য এবং আজকের বাস্তব চিত্র মেলালে তিনি একজন মিথ্যাবাদী সাক্ষী হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন।
নিজের যুক্তির স্বপক্ষে দুলু বলেন, মি. আজমী জবানবন্দিতে বলেছিলেন, তিনি সেখানে থাকাকালীন আলো, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য বা গাছপালা কিছুই দেখেননি। অথচ আজকে তাঁর ব্যবহৃত ১৭ ফুট বাই ২১ ফুটের যে এসি রুমটি আমাদের দেখানো হলো, সেখানে দক্ষিণ দিকে দুটি জানালা আছে। সেই জানালা দিয়ে অন্তত ২০ বছরের পুরোনো বড় গাছ দেখা যায়। যে ব্যক্তি গাছ দেখেননি, সে মেস বি-র উল্টো দেয়াল দেখলেন কীভাবে? এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আদালতের নজির টেনে এই আইনজীবী আরও বলেন, ট্রাইব্যুনাল ৩৪ নম্বর আদেশের মাধ্যমে এই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছেন। রুয়ান্ডা এবং যুগোস্লাভিয়ার উদাহরণ টানা হলেও সেখানে বিচারকেরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন সব সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর, আর্গুমেন্টের আগে। আগে পরিদর্শনে গেলে সাক্ষ্য গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আমরা এই বিষয়টি আগামীতে উচ্চ আদালতে তুলব।
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুর মিসবাহ বলেন, আমাদের মক্কেল মেজর জেনারেল শেখ সারওয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তানভীর সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব জেআইসি ডিরেক্টর ছিলেন। জেআইসি একটি ফ্যাসিলিটি মাত্র, যেমন জেলখানা। জেল সুপার যেমন ঠিক করেন না কাকে আনা হবে বা ছাড়া হবে, তাঁদেরও তেমন কোনো ব্যক্তিগত দায় নেই। প্রসিকিউশন এখন পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অপরাধের কোনো দলিলাদি দাখিল করতে পারেনি।
অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষে আরেক আইনজীবী মাহিন এম রহমান বলেন, আমাদের মক্কেলরা ৫ আগস্টের পর পালিয়ে যাননি, কারণ তাঁরা কোনো অপরাধ করেননি। তাঁরা কেবল একটি ব্যুরোর পরিচালক ছিলেন। জেআইসি নব্বইয়ের দশকে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। কোনো পদে থাকার কারণে কাউকে মানবতাবিরোধী অপরাধী বানানো যায় না। প্রসিকিউশন মূল অপরাধীদের খুঁজে না পেয়ে আমাদের এই তিন জেনারেলকে ‘স্কেপগোট’ (বলির পাঁঠা) বানানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে আসামিপক্ষের এসব বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যখন যেমন মন চান কথা বলেন; তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের ডিফেন্সের বন্ধুরাও একই ভাষায় বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছেন।
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, ডিজিএফআইয়ের প্রধান, পূর্বনির্বাচিত সংবাদমাধ্যমকর্মী সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ডালিম, কার্যনির্বাহী সদস্য মাজহারুল হক মান্না, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মো. ইয়াসিন, সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্না এবং নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের এই জেআইসিতে বা ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবেই ট্রাইব্যুনালের এই পরিদর্শন।
আরএনবি/এআর




