প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ‘বিয়ের প্রলোভনে’ শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির বিধান কেন অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিচারপতি হাবিবুল গণি এবং বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসাইনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(খ) ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ‘এইড ফর ম্যান ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নাদিম জনস্বার্থে এই আবেদনটি করেন। আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান।
আদালত তার আদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে সংযোজিত ৯(খ) ধারাটি কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন।
আইন সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মূল ৯ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা থাকলেও পরবর্তীতে ৯(খ) ধারাটি যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো পুরুষ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে এবং এর সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের কারাদণ্ড।
আদালতের আদেশের পর রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণের বিভিন্ন দিক ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে ৯(খ) ধারা ইনসার্ট (যুক্ত) করে ‘বিয়ের প্রলোভনে’ সম্পর্ককেও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো পুরুষ যদি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করেন এবং পরবর্তীতে বিয়ে না করেন, তবে তার সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে।’
আইনজীবী এই ধারাটিকে ‘বৈষম্যমূলক’ ও ‘সংবিধান বিরোধী’ দাবি করে বলেন, ‘দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যখন নিজেদের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান, সেখানে শুধুমাত্র জেন্ডার বা লিঙ্গের ভিত্তিতে পুরুষকে দায়ী করা এবং ক্রিমিনালাইজ করা সংবিধানের পরিপন্থী।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই আইনটির ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিবাহিত মহিলারাও একাধিক সন্তানের জননী হওয়া সত্ত্বেও বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলা করছেন। অথচ তিনি নিজেই একটি ম্যারিটাল রিলেশনশিপে (বৈবাহিক সম্পর্ক) থাকা অবস্থায় অন্য সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু তার ক্ষেত্রে কোনো শাস্তির দায় নেই।’
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আইনের অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করে ইশরাত হাসান বলেন, ‘বিয়ে একটি ধর্মীয় বিষয়। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী বিয়ের আগে এ ধরনের সম্পর্ক (জিনা) নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য। কিন্তু এই আইনে বলা হচ্ছে, বিয়ে করলে এটি অপরাধ নয়, আর বিয়ে না করলে শুধুমাত্র পুরুষ অপরাধী। এটি একটি অদ্ভুত আইনি বিধান।’
হাইকোর্টের রুল অনুযায়ী, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর এই বিতর্কিত ধারাটি কেন অবৈধ ও অকার্যকর ঘোষণা করা হবে না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে।
এর আগে হাইকোর্টের একাধিক পর্যবেক্ষণে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’ সংক্রান্ত মামলাগুলোকে নিরুৎসাহিত করা হলেও সংশোধিত আইনে এই বিধানটি নতুন আঙ্গিকে যুক্ত করা হয়েছিল। আজকের এই রুলের মাধ্যমে বিতর্কিত ধারাটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল।
আরএনবি/এএইচ



