বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আদালতে ‘আয়নাবাজি’, আত্মসমর্পণ করতে এসে ভুয়া আসামি আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

শেয়ার করুন:

আদালতে আয়নাবাজি, আত্মসমর্পণ করতে এসে ভুয়া আসামি আটক
ছবির বামে মামলার ভুয়া আসামি মনোয়ারা এবং ডানের ছবিতে প্রকৃত আসামি নাসরিন সিকদার

রুপালি পর্দায় ‘আয়নাবাজি’ দেখে অবাক হয়েছিলেন অনেকেই। সেখানে অন্যের মামলায় ভাড়া করা আসামি হয়ে জেল খাটতে দেখা যায় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীকে। এবার বাস্তবেই আদালতে আয়নাবাজি করতে এসে আটক হলেন এক নারী। 

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ তানিয়া সুলতানা লিপির আদালতে এ ঘটা ঘটে।

এদিন চেক ডিজঅনারের একটি মামলায় আসামি নাসরিন সিকদার সেজে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে এসে ধরা পড়েন ওই নারী। নাম মনোয়ারা। তার দাবি, আইনজীবী তাকে নাসরিন সাজিয়ে আদালতে নিয়ে এসেছেন।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর কামরুজ্জামান সুমন। আটক নারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গত বছরের ২৩ মার্চ ২৯ লাখ টাকা চেক ডিজঅনারের অভিযোগে নিবেদিতা আহমেদ তুলি নামে একজন সরকারি চাকরিজীবী আদালতে মামলা দায়ের করেন নাসরিন সিকদার নামে এক নারীর বিরুদ্ধে। মামলার দিন ধার্য ছিল ১৬ জুন। 

কিন্তু আসামি নাসরিন সিকদার সেদিন আসামি আদালতে হাজির হননি। সে কারণে আদালত আসামির জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেনি। পরবর্তী মামলার শুনানির দিন রাখা হয় ২০ আগস্ট।

তবে তার আগেই বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) আসামি নাসরিন সিকদারের হয়ে আরেক নারী মনোয়ারাকে আদালতে হাজির করে জামিন আবেদন করেন আইনজীবী হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন।

শুনানিকালে ভুয়া আসামি মনোয়ারাকে এজলাসের সামনে ডেকে নেন বিচারক তানিয়া সুলতানা লিপি। এ সময় তার মুখে মাক্স পরা ছিল। বিচারক মাক্স খুলতে বলেন। কয়েক দফা বলার পরও মাক্স খুলতে রাজি হননি মনোয়ারা। পরে পুলিশের একজন নারী সদস্য তার মুখ থেকে মাক্স খুলে নেন।

22
আদালতে প্রকৃত আসামির হয়ে হাজিরা দিতে আসা ভুয়া আসামি মনোয়ারা

সংশ্লিষ্ট আদালতের অফিস সহায়ক শাহ আলম বলেন, ‘যার বিরুদ্ধে মামলা তার বাসা গুলশানে। আর মামলা ২৯ লাখ টাকার। মনোয়ারার বেশভূষা দেখে সন্দেহ হয় বিচারকের। স্বামীর নাম, বাবার নাম জানতে চান। স্বামীর নামের জায়গায় বাবার নাম আর বাবার নামের জায়গায় বলেন স্বামীর নাম।’

তিনি বলেন, ‘বিচারক তার কাছে জানতে চান, কত টাকার মামলা। মনোয়ারা বলেন, ৩০ লাখ টাকার।’ বিচারক জানতে চান, এত টাকা দিয়ে কী করেছেন?’ মনোয়ারা বলেন, ‘আর কইয়েন না, স্যার।’ আপনি তাহলে কেন আসছেন। মনোয়ারা বলেন, ‘মামলা খালাস করতে আসছি।’

অফিস সহায়ক বলেন, ‘বিচারক তার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে মনোয়ারা আইনজীবীর চেম্বারে রেখে এসেছেন বলে জানান। তিনি সেখান থেকে পরিচয়পত্র নিয়ে আসার কথা বলেন। তবে বিচারক তাকে যেতে দেননি। মনোয়ারাকে স্বাক্ষর করতে বললেও তিনি দিতে পারেননি, টিপসই দেন। এরই মাঝে এজলাস ছেড়ে বেরিয়ে যান আইনজীবী হাম্মাদ এমদাদ হোসাইন।

পরে বিচারক মনোয়ারাকে আসামির কাঠগড়ায় আটকে রাখার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। মনোয়ারা নিজের ছবি দিয়ে নাসরিন সিকদার নামে জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি করেছেন বলেন অফিস সহায়ক শাহ আলম।

এরপর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মনোয়ারার কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, কেন তিনি আদালতে এসেছেন। কোনো জবাব না দিয়ে এসময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

পরে মনোয়ারা জানান, তার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। সূত্রাপুরের কলতাবাজারে পরিবারের সঙ্গে থাকেন। বাসা-বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি আইনজীবীদের চেম্বার পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তিনি।

মনোয়ারার ভাষ্য, টাকা দেওয়ার কথা বলে আইনজীবী তাকে নিয়ে এসেছেন। এবারই প্রথম এসেছেন বলে দাবি করেন করেন। কত টাকা দেবে- এমন প্রশ্নে মনোয়ারা বলেন, ‘টাকার কথা কয় নাই।’ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে ওই নারী বলেন, ‘আর কথা কইয়েন না। মাথা ঘোরে।’

এরপর আবার অঝোরে কাঁদতে থাকেন মনোয়ারা। তিনি বলেন, ‘আমি কাম করে খাই। আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে বাসায়। আল্লাহর ওয়াস্তে আমারে ছাইড়া দেন। আল্লাহ আপনাদের ভালো করবে।’

যদিও এ ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী এমদাদ হোসাইন। ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমের কাছে আসামির নাম জানতে চান। নাম শুনে বলেন, ‘আমি খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।’ এরপর ফোন কেটে দেন।

অন্যদিকে বাদী পক্ষের আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মামলার প্রকৃত আসামি নাসরিন সিকদার একজন বাটপার। আওয়ামী লীগের সময়ে মন্ত্রী-এমপিদের নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা প্রতারণা করেছেন। মামলার পর মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।’

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, নাসরিনের সঙ্গে নিবেদিতা আহমেদ তুলির পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় বিভিন্ন সময় ফ্ল্যাট কেনার জন্য ২৯ লাখ টাকা দেন। এর পরিবর্তে গত বছরের জানুয়ারির ২৭ তারিখ ব্র্যাক ব্যাংকের একটা দেন। 

পরবতীকে বাদী তার নামে সোনালী ব্যাংকে চেকটা নগদায়নের জন্য জমা দিলে অপর্যাপ্ত তহবিলে ডিজঅনার হয়। এরপর গত বছরের ২৩ মার্চ মামলা করেন ভুক্তভোগী নিবেদিতা। সেই মামলায় ‘আয়নাবাজি’ করতে এসে ভুয়া আসামি নিজেই এখন বিপাকে।

এএইচ  

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর