ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় খুন হওয়া ঝিনাইদহ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার অপহরণ, হত্যার পরিকল্পনা ও খুনের মামলার আসামি আমানুল্লা সাইদ ওরফে শিমুল ভূঁইয়াকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।
সোমবার (৮ জুন) বিচারপতি জাফর আহমেদ ও বিচারপতি শাতিকা হোসেনের বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। আদালতের কার্যতালিকা থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে হাইকোর্টের জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে মঙ্গলবার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
শিমুল ভূঁইয়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের (খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ) নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতা। আনার হত্যাকাণ্ডের অন্যতম রূপকার ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে তাকেই চিহ্নিত করেছিল পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের শিকার সংসদ সদস্যের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিনের করা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে দুই দফায় মোট ১৩ দিনের রিমান্ড শেষে ২০২৪ সালের ৫ জুন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন শিমুল। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই রয়েছেন।
ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম তোফাজ্জল হোসেনের খাসকামরায় দেওয়া জবানবন্দিতে শিমুল জানিয়েছিলেন, এমপি আনারের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। আবার ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী আখতারুজ্জামান শাহীনের সঙ্গেও এমপি আনারের ব্যবসায়িক বিরোধ ছিল।
বিজ্ঞাপন
জবানবন্দি অনুযায়ী, শিমুল ও শাহীন দীর্ঘদিন ধরে আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করে আসছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি ও মার্চে দুটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর শাহীন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বসে আসামিদের সঙ্গে নতুন ছক কষেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবসার লোভ দেখিয়ে এমপি আনারকে কলকাতায় যেতে রাজি করান শিমুল ও অন্য আসামিরা। কলকাতার অভিজাত নিউটাউন এলাকায় শাহীনের একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাট ছিল। সেখানে ৩০ এপ্রিল শিমুল ও শিলাস্তি (সেলেস্টি) রহমান বাংলাদেশ থেকে গিয়ে ওঠেন। ৬ মে শিমুলের ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়াও কলকাতায় যান। ওই ফ্ল্যাটে আগে থেকে অবস্থান করছিলেন জিহাদ ও সিয়াম। পরে সেখানে যোগ দেন মোস্তাফিজ, তাজ, জামালসহ আরও কয়েকজন।
এই মামলায় বাংলাদেশে গ্রেফতার হওয়া অপর দুই আসামি তানভীর ভূঁইয়া ও সেলেস্টি রহমানও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
শিমুল জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের ১০ মে আখতারুজ্জামান শাহীন সবার সঙ্গে বৈঠক করে দায়িত্ব বণ্টন করে বাংলাদেশে চলে আসেন। আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে সর্বশেষ কলকাতা বিমানবন্দরের পাশে ‘ওটু’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে বৈঠক হয়, যেখানে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়।
তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী সবাই মিলে এমপি আনোয়ারুল আজিমকে প্রলুব্ধ করে কলকাতায় তার বন্ধুর বাড়ি থেকে ডেকে নিউটাউন এলাকায় সঞ্জীবা গার্ডেনসের আবাসিক ভবনে শাহীনের ভাড়া বাসায় নেওয়া হয় এবং সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়।
একই বছরের ১১ মে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান আনোয়ারুল আজীম আনার। প্রথমে কলকাতার বরাহনগরে তার বন্ধু স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে ওঠেন। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হলে স্থানীয় থানায় জিডি করেন গোপাল বিশ্বাস।
এরপর ২২ মে সকালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, নিউ টাউনের এক বাড়িতে খুন হয়েছেন এমপি আনার। ওই দিনই তার মেয়ে ডরিন শেরেবাংলা নগর থানায় বাবাকে খুনের উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
ভারতীয় পুলিশের দেওয়া তথ্যে দেশে তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা হলেন— আমানুল্লা সাঈদ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, তানভীর ভূঁইয়া ও সেলেস্টি রহমান। ২০২৪ সালের ২৪ মে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
সে সময় পুলিশ বলেছে, এমপি আনার হত্যার ‘হোতা’ তার বাল্যবন্ধু ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আখতারুজ্জামান ওরফে শাহীন মিয়া। আর হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়ন করেছেন চরমপন্থি নেতা শিমুল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সংসদ সদস্যকে হত্যার পর শরীরের বিভিন্ন অংশ টুকরো করে হলুদ লাগিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। পরে কলকাতার ওই বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে মাংসের টুকরা উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠায় পুলিশ।
এফএ




