বিচার বিভাগের বাজেট পৃথকীকরণ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তাদের মতে, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ জন্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে পৃথক বাজেট কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলরুমে বাংলাদেশ ল'ইয়ার্স কাউন্সিল আয়োজিত ‘আইনজীবীদের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব বলেন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ ল'ইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি মো. জসীম উদ্দীন সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শহীদুল ইসলাম। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান আকন্দ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মো. ইউসুফ আলী।
মূল প্রবন্ধে মতিউর রহমান আকন্দ বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বাজেটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বাজেট প্রণয়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি, আদালতের অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ, প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ, আদালতের নথি ও মামলা ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন, বিচার বিভাগীয় গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচারক ও কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ানো, নিরাপত্তা জোরদার, সংস্কার ও কর্মদক্ষতা তহবিল গঠন এবং আইন ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধসহ ১১টি খাতে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব তুলে ধরেন।
মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, বিচার বিভাগের জন্য কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে সেটিই মূল বিষয় নয়, বরং সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পদোন্নতি ও অর্থায়নের জন্য যে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল, তা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে পারে না। বিচারিক স্বাধীনতার জন্য সাংবিধানিক নিশ্চয়তার পাশাপাশি আর্থিক স্বায়ত্তশাসনও প্রয়োজন।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ক্রমে নির্বাহী বিভাগ থেকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে হস্তান্তর করা। অন্যথায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আংশিকভাবেই বাস্তবায়িত থাকবে।
বিজ্ঞাপন
সেমিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা বিচার বিভাগের বাজেট পৃথকীকরণ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিচার বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় বিচারকার্যে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের অভিযোগও দেখা যায়। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ও আর্থিক পৃথকীকরণ জরুরি।
বিচারপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগের জন্য সরকারের বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমানে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়ে বিচারকার্য সুষ্ঠুভাবে ও সময়মতো সম্পন্ন করা কঠিন। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ সীমিত বাজেট। তিনি বলেন, বিচারক ও আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিচার বিভাগের সার্বিক সক্ষমতা উন্নয়নের জন্য পৃথক বাজেট কাঠামো ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন অপরিহার্য।
সেমিনারে প্রবন্ধের ওপর আরও আলোচনা করেন বাংলাদেশ ল'ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন, ড. হেলাল উদ্দিন, এস. এম. কামাল উদ্দিন, আবদুর রাজ্জাক, মো. সাইফুর রহমান, এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার, ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া, মহিন উদ্দিন, আবু বক্কর সিদ্দিক, শাহ মাহফুজুল হক চৌধুরী, গোলাম নুর তরুণ, মো. শামসুজ্জামান, রেজাউল ইসলাম রেজা, পারভেজ হোসেন, শাহীন আখতার ও মো. নাঈম উদ্দিন লিখন।
টিএই/ক.ম




