বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ঢাকা

সাক্ষী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন কতদূর?

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২২, ০৯:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

সাক্ষী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন কতদূর?

নিরাপত্তা নেই, তার ওপর উল্টো অন্যের কাজে নিজের পকেটের পয়সা খরচ। এতসব করলেও প্রাণনাশের ভয়ভীতি তো আছেই। তাহলে কেন কেউ আদালতে আসবেন সাক্ষী দিতে? ফলে এমন সব বাস্তবতার কথা বিবেচনায় বাংলাদেশে সাক্ষী সুরক্ষা আইন জরুরি বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। যদিও ইতোমধ্যেই আইনটি করতে নির্দেশও দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট। তবে এখনও বাস্তবায়ন নেই আদেশের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১০ জুলাই একটি হত্যা মামলায় হীরা ওরফে হারুন নামে একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ওই মামলায় ২০১২ সালের ৫ জুন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন মহানগর দায়রা জজ আদালত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ১০ দিন পার হয়ে গেলেও সাক্ষীরা কেউ সাক্ষ্য দিতে আসেননি। এমন অবস্থায় আসামি হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন।


বিজ্ঞাপন


তবে আদালত জামিন আবেদনের শুনানি করে তা খারিজ করে দেন। সেই সঙ্গে সাক্ষীরা কেন আদালতে আসছেন না, তা অনুসন্ধান করতে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আসাদুজ্জামানকে তলব করেন। সে সময় আসাদুজ্জামান আদালতে হাজির হয়ে বলেন, ‘আসামি প্রভাবশালী। সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এই কারণে আসছেন না।’

পরে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ এ কে এম মনিরুজ্জামান কবির জানান, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আসাদুজ্জামানের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আদালত সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে আদালত আইনে সমন পাওয়ার পর সাক্ষী না এলে সে ব্যাপারে সরকারি কৌঁসুলি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশকে জবাবদিহির আওতায় আনার ধারাও সংযুক্ত করতে বলেছেন।

Court

পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে এ বিষয়ে এক মামলার আসামির জামিন আবেদনের শুনানির সময় সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এবং নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই আইন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সময় একটি হত্যা মামলার আসামির জামিন শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। সেই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইন সচিবকে এই আদেশ পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।


বিজ্ঞাপন


যদিও সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন। সম্প্রতি এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার আইন করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। আদালতে সাক্ষীরা যাতে ভোগান্তিহীনভাবে সাক্ষ্য দিতে পারেন সে জন্য জেলাগুলোতে ইতোমধ্যে হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, সাক্ষীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার আইন প্রণয়নের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সাক্ষী সুরক্ষা আইন জরুরি বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকর ঢাকা মেইলকে বলেন, সাক্ষীরা আদালতে আসতে অনীহা প্রকাশ করেন নিরাপত্তার অভাবে। যে কারণে মামলাগুলো ঝুলে থাকে দিনের পর দিন। এ কারণে মামলাজট বেড়েই যাচ্ছে।

Court

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, যদি সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসার সুরক্ষা দেওয়া হয়, তবে এসব জটিলতা কেটে যাবে, মামলাও নিষ্পত্তি হবে দ্রুত। সুপ্রিম কোর্ট এক নির্দেশনায় বলেছেন, পুরনো মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে। ২০২০ সালের আগের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ মামলাগুলো বিচারিক আদালতে ঝুলে আছে, কারণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেন না।

আইনজীবী প্রশান্ত কর্মকার আরও বলেন, আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসলে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে আসতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো আর্থিক সাপোর্ট নেই। তবে সরকারি কর্মকর্তা বা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে আসলে তাদের খরচ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো মামলার সাক্ষী আদালতে আসার ক্ষেত্রে ভাড়া পরিশোধ করার বিধান নেই। এসব কারণের পাশাপাশি আইন না থাকায় সাক্ষীরা আদালতে আসেন না।

একই কথা জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী মোহাম্মাদ ফারুক হোসেন। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের অভাবে সাক্ষীরা আদালতে আসেন না। এতে করে ন্যায়বিচার মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। সুরক্ষা না থাকেলে সাক্ষীরা কোর্টে আসেব না, ভয়ভীতি পাবে- এটাই স্বাভাবিক। মানুষ মৌলিক ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। এই আইনটি করা হলে সাক্ষীরা আদালতে আসবে নির্ভয়ে। সেই সঙ্গে ন্যায়বিচারও নিশ্চিত হবে।

এআইএম/আইএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর