মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

হাসিনা–কামালের আমৃত্যু রায়ের সাজা বাড়াতে আপিল করবে প্রসিকিউশন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

হাসিনা–কামালের আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করবে প্রসিকিউশন

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ে একটি অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম. এইচ. তামীম জানান, আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া অভিযোগটিতে সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হবে।


বিজ্ঞাপন


এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “গত ১৭ নভেম্বরের রায় আমরা পেয়েছি। আমরা দেখেছি একটি অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরেকটি অভিযোগে তাঁদের দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে যে অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে। সেখানে শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হবে।”

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ডের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা পেয়েছেন।

গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ ঘোষিত ঐতিহাসিক রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার আইনজীবীরা।

রায়ে দণ্ডের পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১। একই সঙ্গে শহীদদের পরিবার ও আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।


বিজ্ঞাপন


ঐতিহাসিক এই রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, “হাত, পা, নাক, চোখ, মাথার খুলি হারানো যেসব সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁদের বাস্তব অবস্থা দেখলে স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। ফলে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যেকোনো মূল্যে বিচারের আওতায় আনা উচিত। ন্যায়বিচার ব্যহত হওয়ার সুযোগ নেই।”

মানবতাবিরোধী অপরাধে আনা পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম অভিযোগে শেখ হাসিনাকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা ও উস্কানি দেওয়া, আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ এবং অপরাধ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার কারণে তিনি দায়ী। এসব অপরাধে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, জুলাই গণ–আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩–এর ৩(২)(ছ)(জ) ও ৪(১)(২)(৩) ধারার অপরাধ করেছেন। একই অভিযোগে গত ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনার দায়ও তাঁর ওপর আরোপ করা হয়। এসব অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল বলেন, একই অপরাধে সহ–আসামি আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন সমানভাবে দায়ী। এর জন্য আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে মামুন রাজসাক্ষী হয়ে সত্য ঘটনা আদালতে তুলে ধরায় আদালত তাঁর প্রতি নমনীয়তা দেখিয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

এই মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এস. এইচ. তামীম শুনানি করেন। এছাড়া প্রসিকিউটর বি. এম. সুলতান মাহমুদ, শাইখ মাহদি, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন শুনানি করেন। আর রাজসাক্ষী চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।

এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণ–অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের পিতা–সহ বহু স্বজনহারা পরিবার। স্টার উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ–এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। মোট ৫৪ জন সাক্ষী এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আবদুল্লাহ আল–মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১। পরে দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উন্মোচনে রাজসাক্ষী হন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন।

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগ সরকার, তাদের দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসনসহ আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে—এমন অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একের পর এক জমা পড়ে। এখন দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব অভিযোগের বিচার চলছে।

এআইএম/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর