ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনের জি এস পদপ্রার্থী এস এম ফরহাদের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে করা রিটের শুনানি শুরু হয় সকাল ১১ টা ১০ মিনিটে। এদিন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির বেঞ্চ আপিল বিভাগে বসেন।
বুধবার (৩সেপ্টেম্বর) এই মামলাটি আপিল বিভাগের এক নম্বর কার্যতালিকায় ছিল।
বিজ্ঞাপন
আজকে শুনানিকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। টানা দুই ঘণ্টার বেশি সময় শুনানি হয়। মাঝে ১০ মিনিটের বিরতি নেন বিচারপতিরা।
আরও পড়ুন: ৯ সেপ্টেম্বরই ডাকসু নির্বাচন: আপিল বিভাগ
এদিন আদালতে রিট পিটিশনের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম। সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন মোহাম্মদ শিশির মনির। নির্বাচনে জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন ইমরান এ সিদ্দিকী।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে আহসানুল করিম বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু জিএস প্রার্থী এসএম ফরহাদ হোসেনের প্রার্থিতা বাতিল করা হোক। কারণ তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। যেহেতু ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার কারণে জুলিয়াস সিজারের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, একই গ্রাউন্ডে এসএম ফরহাদ হোসেনের প্রার্থিতাও বাতিল করা হোক।
বিজ্ঞাপন
পরে এসএম ফরহাদের আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিকী বলেন, এসএম ফরহাদ হোসেন কখনো কোনোদিন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। এ বিষয়ে তিনি একটি লিখিত দিয়েছেন। তার ব্যাপারে প্রতিপক্ষ সবসময় যড়যন্ত্র করছে।
সিদ্দিকী বলেন, ফরহাদ ছিলেন ডিবেট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। সে হিসেবে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এজন্য তার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি ছিল। এটি দিয়ে ছাত্রলীগ প্রমাণ করতে ফরহাদের প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
পরে আদালত এসএম ফরহাদ হোসেনের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে রিটের শুনানি শেষ করেন। এ রিটের শুনানি করে গত ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ঢাকসু নির্বাচন স্থগিত করেন। ওইদিনই হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত। চেম্বার আদালতের আদেশ আজ আপিল বিভাগ বহাল রাখলেন। অর্থাৎ ৯ সেপ্টেম্বর তারিখের ভোটগ্রহণে আর কোনো বাধা রইল না।
পাশাপাশি ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশও স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ।
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণ বেঞ্চ এই রায় দেন। এর আগে এর ওপর দীর্ঘ সময় শুনানি হয়।
এর আগে মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) চেম্বার আদালতের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ বহাল রাখেন এবং বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।
গত রোববার হাইকোর্ট এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ডাকসুর নির্বাচন প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকার কার্যক্রম ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করে আদেশ দেন। এতে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ডাকসু নির্বাচন অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
এরপরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেম্বার আদালতে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে আবেদন করে। সোমবার বিকেলে চেম্বার আদালত হাইকোর্টের আদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করে, যা মঙ্গলবার পর্যন্ত কার্যকর ছিল। একইসঙ্গে আদালত নির্দেশ দেন, নিয়মিত বেঞ্চে দেওয়ানি বিবিধ আবেদন (সিভিল মিসলেনিয়াস পিটিশন) না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন আদালতে জমা দেয়। বিকেলে আবেদনটি আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেন।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এস এম ফরহাদ। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। তার প্রার্থিতা নিয়েই উঠেছে বিতর্ক।
রিটকারী বিএম ফাহমিদা আলম, যিনি নিজেও ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী। তার অভিযোগ— ফরহাদ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য। তাই তার প্রার্থিতা গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করেছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে ২৮ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নির্বাচন স্থগিত করে।
হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় এস এম ফরহাদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়।
আদালত আরও নির্দেশ দেয়, রিট আবেদনকারী যেন ফরহাদের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়ার প্রমাণসহ ১৫ দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল তখন অভিযোগ যাচাই করে, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শুনে ২১ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দেবে।
প্রায় ২৮ বছর পর সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নুরুল হক নুর, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে গোলাম রাব্বানী এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে সাদ্দাম হোসেন বিজয়ী হন।
প্রায় ছয় বছর পর তফসিল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে সক্রিয় সংগঠনগুলো প্যানেল ঘোষণা করে বেশ জোরেশোরে প্রচার শুরু করে। স্বতন্ত্র প্যানেলও ঘোষণা করা হয়।
তবে ভোটগ্রহণের সপ্তাহখানেক আগে ‘দ্বিতীয় পার্লামেন্ট’ খ্যাত এই নির্বাচন নিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ দেখা দেয়। তবে এই নির্বাচনে সব বাধা কেটে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এআইএম/এএইচ




