ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ ও সবুজ এলাকার সংকটে দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকার নগরজীবন। একসময় পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন থাকলেও ঢাকা এখন নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত। আগামী ১০ থেকে ২০ বছরে ঢাকাকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কী ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন, নগর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা কোথায় এবং সংকট উত্তরণে সরকারের করণীয় কী—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
ঢাকা মেইল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেছেন নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা, পরিবহনব্যবস্থার সংস্কার, জলাশয় ও সবুজ এলাকা পুনরুদ্ধার এবং রাজধানী বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজুর রহমান।
ঢাকা মেইল: ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে শহরটি যেসব সমস্যায় পড়েছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো কী? এগুলো সমাধানে অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। এখানে যেভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হয়েছে, তাতে বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে শহরটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যানজট, জলাবদ্ধতা, খেলার মাঠ, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকার সংকট ঢাকার বাসযোগ্যতার প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে এই শহরের বাতাসের মানও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর পর্যায়ে রয়েছে।
পাশাপাশি প্রতিবছর ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় তিন ফুট বা এক মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির পাশাপাশি উন্মুক্ত জলাশয় ও জলাধারের পরিমাণও কমছে। নদী ও জলাশয়গুলোতে দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখানে মাছ বা অন্যান্য জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে নগরের এসব সমস্যা এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এই শহরের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের বড় একটি অংশ বস্তিতে বসবাস করেন। বস্তিতে বসবাসের কারণে তাঁদের জীবনমানও চরমভাবে বিপর্যস্ত।
ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারের সবার আগে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের যথাযথ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এখনো ঢাকার জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ঢাকায় অবারিতভাবে মানুষ আসছে। তাঁদের কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ফুটপাতে হকারি কিংবা অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু শহরের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা বহন করার সক্ষমতা ঢাকার নেই।
অন্যদিকে শিল্পমালিকেরা ঢাকার আশপাশে যত্রতত্র শিল্পকারখানা গড়ে তুলছেন। এসব কারখানার দূষণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আবাসন ব্যবসায়ীরাও জলাশয় ও জলাধার ভরাট করছেন। ফলে পানি নামার জায়গা থাকছে না।
সব মিলিয়ে ঢাকা এমন একটি নগরী, যেখানে ধারণক্ষমতার চার-পাঁচ গুণ জনসংখ্যা বসবাস করছে। এর ফলে বাসযোগ্যতার প্রতিটি সূচকে শহরটি পিছিয়ে পড়ছে।
ঢাকা মেইল: ঢাকার আবাসন, সড়ক, বাণিজ্যিক এলাকা ও নাগরিক সেবার মধ্যে পরিকল্পনাগত সমন্বয়ের অভাব কতটা? রাজধানীকে একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার আওতায় আনতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: ঢাকার আবাসন, সড়ক, বাণিজ্যিক এলাকা ও নাগরিক সেবার মধ্যে পরিকল্পনাগত সমন্বয় নেই। একটি এলাকা, শহর বা নেইবারহুডের নকশা করতে গেলে সেখানে কত মানুষ বসবাস করবেন, সেই নির্দিষ্ট জনসংখ্যা বা ডিজাইন পপুলেশন বিবেচনায় নিতে হয়। সেই জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখেই নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য পরিষেবার পরিকল্পনা করতে হয়।
কিন্তু ঢাকায় দেখা যাচ্ছে, কোনো একটি এলাকার শুধু ভূমি ব্যবহার বা ল্যান্ড ইউজ নির্ধারণ করা হচ্ছে। ডিজাইন পপুলেশন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে না। ফলে একটি এলাকার পরিষেবা এবং সেই পরিষেবা দেওয়ার জন্য যে পরিমাণ জনসংখ্যা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি মানুষ সেখানে বসবাস করছেন।
এ জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। যেমন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ট্রাফিক নিয়ে কাজ করা ডিটিসিএসহ অন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। ফলে শহরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ অপরিকল্পিত এবং বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে।
রাজধানীকে সমন্বিত নগর পরিকল্পনার আওতায় আনতে হলে সব পরিকল্পনাকে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে আনতে হবে। ঢাকার জন্য প্রধানত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভৌত পরিকল্পনা করে। আর বিভিন্ন পরিষেবা দেওয়ার জন্য রয়েছে সিটি করপোরেশন। অন্যদিকে ট্রাফিক পরিকল্পনাগুলোও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে করছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সেতু কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা যে যার মতো পরিকল্পনা করছে। সব পরিকল্পনা যদি একটি নির্দিষ্ট সংস্থার অধীনে বা তত্ত্বাবধানে না থাকে, তাহলে সেগুলো পথ হারাবে।
ঢাকার জন্য সমন্বিত নগর পরিকল্পনা করতে হলে সব সেবা সংস্থাকে একটি ছাতার নিচে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে নগর সরকারের কথা বারবার এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনেও নগর সরকারের ধারণা এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নগর সরকার নিয়ে কাজ করতে সরকারের কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ফলে সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে না।
সরকারের এখন সবার আগে সব সংস্থাকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা হিসেবে সিটি করপোরেশনও দায়িত্ব নিতে পারে। কিন্তু একটি সংস্থার অধীনে সব সেবা সংস্থা না এলে বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকল্প চলতেই থাকবে। সেখানে সেবার চেয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্নীতি করার আগ্রহ বেশি থাকতে পারে।
এ জন্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে সব সংস্থাকে আনতে পারলে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সহজ হবে।
ঢাকা মেইল: যানজট কমাতে শুধু মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক বা নতুন রাস্তা নির্মাণ কতটা কার্যকর? ঢাকার পরিবহনব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে কোন ধরনের পরিকল্পনা সবচেয়ে জরুরি?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: ঢাকার যানজট কমানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারের মনোযোগ ছিল বড় বড় মেগা প্রকল্পের দিকে। মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্প একের পর এক নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্পের পেছনে লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।
অথচ ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) স্বল্পব্যয়ের প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে হাঁটাপথের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি পাঁচটি র্যাপিড ট্রানজিট বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান সড়কগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো সরকারই এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে কাজ করেনি। ফলে ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে যে সম্ভাবনা ছিল, তা অনেকটাই নষ্ট হয়েছে।
এখন আমাদের ভালো মানের বাসসেবা দরকার, যা তুলনামূলক কম খরচে শহরে চালু করা সম্ভব। বিআরটি প্রকল্প বাতিল করা সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত। বিআরটি সচল করে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত দ্রুতগতিতে মানুষ আনার ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি বিমানবন্দরের সামনে থেকে বিআরটি কীভাবে মূল ঢাকার দিকে সম্প্রসারণ করা যায়, সেই পরিকল্পনাও করতে হবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত। তবে ভবিষ্যতে আরও মেট্রোরেল লাইন তৈরি করতে গেলে সেগুলোর লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে হবে। বিনিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ফুটপাতেও বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু এই বিনিয়োগ হচ্ছে না। বাস রুট রেশনালাইজেশনের প্রকল্পগুলো দিনের পর দিন চললেও সেগুলোকে উন্নত মানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আগ্রহ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
এ জন্য বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো শহরের বাসব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে।
পাশাপাশি মানসম্মত প্যারাট্রানজিট তৈরি করতে হবে। একসময় আমাদের ম্যাক্সি সার্ভিস ছিল, সিএনজিচালিত অটোরিকশাও ছিল। এখন মানসম্মত প্যারাট্রানজিট চালু করতে পারলে ছোট গাড়িতেও অনেক মানুষ পরিবহন করা সম্ভব হবে। ঢাকার বিভিন্ন দূরত্বে এ ধরনের প্যারাট্রানজিট চালু করা গেলে নগরবাসীর ওপর পরিবহনের চাপ কমবে।
ঢাকা মেইল: ঢাকার জলাবদ্ধতা, খাল দখল, জলাধার ভরাট ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়ার সমস্যাগুলো কি মূলত পরিকল্পনার ত্রুটি, নাকি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তদারকির ব্যর্থতা? এ ক্ষেত্রে কোন পদক্ষেপগুলো জরুরি?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: ঢাকার জলাবদ্ধতা, খাল দখল, জলাধার ভরাট ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো, সরকারের নেওয়া পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
১৯৯৫ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রণীত ঢাকার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আরবান এরিয়া প্ল্যানে অনেক এলাকাকে সবুজ এলাকা, জলাশয় ও জলাধার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, তদারকির দুর্বলতা এবং প্রভাবশালীদের চাপে একের পর এক খাল, বিল, জলাধার ও জলাভূমি নষ্ট হয়েছে।
উন্নয়ন দর্শনের দুর্বলতার কারণে আমরা খালকে বক্স কালভার্টে পরিণত করেছি। ফলে সেখানে আগের মতো পানিপ্রবাহের সুযোগ থাকেনি। এখানে পরিকল্পনার ত্রুটি তো আছেই। পাশাপাশি আমাদের উন্নয়ন দর্শনে বাংলাদেশের মাটি, পানি ও আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ কারণেই খালকে বক্স কালভার্টে পরিণত করার মতো দুঃসাহস দেখানো হয়েছে।
যে শহরে এত জলাশয়, খাল ও পুকুরের নেটওয়ার্ক ছিল, সেই নেটওয়ার্ক আমরা ধ্বংস করেছি। উন্নয়ন দর্শনে জলাশয় ও সবুজ এলাকা রক্ষার যে গুরুত্ব থাকা দরকার ছিল, তার অভাবে ব্যবসায়ী ও অনেক সময় প্রভাবশালীরা খাল, বিল, জলাশয়, পার্ক ও খেলার মাঠ দখল করেছেন।
এখনো ঢাকায় যে অল্প কয়েকটি খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো ক্লাবের দখলে। ধানমন্ডির মতো এলাকায় অনেকগুলো মাঠ থাকার পরও একটিতেও সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। বারবার রাজনৈতিক দল ও সরকারকে এ বিষয়ে বলার পরও গুলশানের মতো এলাকার মাঠগুলোও ক্লাবের দখলে রয়েছে।
এই দখলদারত্ব দূর করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার যেসব খাল, জলাশয় ও জলাভূমি অবৈধভাবে দখল হয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন খাল, জলাশয় ও জলাধার তৈরির জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে এলাকাভিত্তিক সবুজ এলাকা, পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরি করা সম্ভব। প্রতিটি ওয়ার্ডে ছেলেদের জন্য একটি এবং মেয়েদের জন্য একটি করে খেলার মাঠ তৈরি করা দরকার। প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি পার্ক থাকা প্রয়োজন, যেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার থাকবে।
ঢাকার যেসব জলাশয় হারিয়ে গেছে, সেগুলো যতটুকু সম্ভব পুনরুদ্ধার করতে হবে। বিদ্যমান জলাশয় ও পুকুরগুলোও রক্ষা করা দরকার।
ঢাকার উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে প্রকৃতিভিত্তিক নগর পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ধরনের পরিকল্পনার মাধ্যমেই ঢাকাকে বাসযোগ্য করা সম্ভব।
ঢাকা মেইল: আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ঢাকাকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে হলে এখনই কোন তিনটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন? এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
ড. আদিল মুহাম্মদ খান: আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ঢাকাকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে হলে সবার আগে ঢাকার সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ জন্য সঠিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঢাকাকে ধীরে ধীরে বিকেন্দ্রীকরণের দিকে নিয়ে যেতে হবে।
ঢাকায় যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা শিল্পকারখানা পরিচালনার প্রয়োজন নেই, সেগুলো ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরে অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে নিয়ে যেতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া আমাদের কোনো মুক্তি নেই।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিভিন্ন এলাকায় বিকেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারণ, দেশে অনেক আঞ্চলিক মহাসড়ক তৈরি হয়েছে। এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলে এবং সেসব অঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা গেলে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব। পাশাপাশি করের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হলে অনেকেই ঢাকার বাইরে যেতে উৎসাহিত হবেন।
তবে সবার আগে ঢাকার ভেতরে যত্রতত্র বৈধ-অবৈধভাবে কৃষিজমি ও জলাভূমি ভরাট করে শিল্পকারখানা কিংবা বিভিন্ন অফিস-আদালত নির্মাণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
একদিকে ঢাকার ভেতরে কঠোর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে ঢাকার বাইরে যেসব এলাকাকে উন্নয়নের ধারায় আনতে চাই, সেসব এলাকার জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। সেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি হলে মানুষ দ্বিতীয় সারির শহর, বিভাগীয় শহর কিংবা অন্যান্য শহরে বসবাস করতে আগ্রহী হবে।
কারণ, ঢাকার বাসযোগ্যতা এখন যে পর্যায়ে রয়েছে, বাতাস ও পানির মান যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে ঢাকা আর খুব বেশি আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানের টানেই মানুষ ঢাকায় আসে। তাই ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন।
পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৈরি ঢাকার ভৌত পরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করেই অন্যান্য অবকাঠামো, সড়ক ও ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। সমন্বয়ের অভাবে আমাদের অনেক মূল্যবান অর্থ নষ্ট হচ্ছে।
এ জন্য আন্তসংস্থার সমন্বয় দরকার। ভৌত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনঘনত্ব ব্যবস্থাপনাও করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। আর তা করতে হলে নগর সরকারের ধারণা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
এভাবে ঢাকার ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাকে টেকসই করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ছড়িয়ে দিয়ে রাজধানীর ওপর চাপ কমানো যাবে। তাহলেই ধীরে ধীরে ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এআর




