বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

‘এক কোটি টাকার ফ্ল্যাটে ১৬ লাখ টাকা নিবন্ধন ব্যয়, এটা অস্বাভাবিক’

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

‘এক কোটি টাকার ফ্ল্যাটে ১৬ লাখ টাকা নিবন্ধন ব্যয়, এটা অস্বাভাবিক’

আবাসন মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও ক্রমবর্ধমান নির্মাণ ব্যয়, উচ্চ নিবন্ধন ফি, ব্যাংকঋণের চড়া সুদ ও নানা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতায় মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, ভবনের নকশা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, গ্রাহক হয়রানি এবং আবাসন ব্যবসায় জবাবদিহির ঘাটতিও এ খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এসব সংকট থেকে উত্তরণে নিবন্ধন ব্যয় কমানো, স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ, ঢাকার আশপাশে স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলা এবং নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল করার ওপর জোর দিচ্ছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)।

সংগঠনটির সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাতকে শুধু ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক প্রতারণা বন্ধে আবাসন ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

ঢাকা মেইলকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাব্বানি।

ঢাকা মেইল: মধ্যবিত্তের জন্য রাজধানীতে সাধ্যের মধ্যে ফ্ল্যাট কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন নিশ্চিত করতে রিহ্যাবের কোনো উদ্যোগ আছে কি?

আলী আফজাল: রিহ্যাব ও এর সদস্যরা বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা। দিন শেষে সবাইকে ব্যবসার খরচ তুলে আনতে হয়। কেউ তো লোকসান দিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে আবাসন খাতে, বিশেষ করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ফ্ল্যাট কেনাবেচা অনেক কমে গেছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়েছে। আমাদের হিসাবে, নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। বাজেটে আমরা আশা করেছিলাম, রড-সিমেন্টসহ নির্মাণশিল্পের সহযোগী খাতগুলোর ওপর কর বাড়ানো হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়েছে। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণের মোট খরচ বেড়ে গেছে। এই বাড়তি ব্যয় উপেক্ষা করে উদ্যোক্তাদের পক্ষে কম দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করা সম্ভব নয়।

এ অবস্থায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। আবাসন অন্য সাধারণ ব্যবসার মতো নয়। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। দেশের ১৮ কোটি মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বেসরকারি খাত রাষ্ট্রের সেই দায়িত্ব পালনে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। তাই এই খাতকে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।

ঢাকা মেইল: আবাসন ব্যয় কমাতে সরকার কোন কোন ক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারে?

আলী আফজাল: প্রথমেই ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ব্যয় কমাতে হবে। বাংলাদেশে ফ্ল্যাট বা জমি নিবন্ধনের খরচ অত্যন্ত বেশি। মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর, হংকং ও থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন ব্যয় প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। অথচ বাংলাদেশে এলাকাভেদে নিবন্ধনসহ সংশ্লিষ্ট খরচ ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হয়। একজন ক্রেতাকে এক কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে শুধু নিবন্ধন বাবদ ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হলে সেটি অস্বাভাবিক।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকঋণের সুদ কমাতে হবে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হচ্ছে। ঋণ ব্যবস্থাপনার অন্যান্য খরচ যোগ করলে কার্যকর ব্যয় ১৮ থেকে ১৯ শতাংশে দাঁড়ায়। এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন।

তৃতীয়ত, ক্রেতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের গৃহঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদে গৃহঋণ নিয়ে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও সরকার-সমর্থিত ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেওয়া হয়।

আমরা চাই, বাংলাদেশেও ক্রেতাদের জন্য ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি আবাসন উদ্যোক্তাদের এক অঙ্কের সুদে, অর্থাৎ ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। এতে নির্মাণ ব্যয় কমবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফ্ল্যাট আনা সহজ হবে।

ঢাকা মেইল: সরকার বিভিন্ন শিল্পের জন্য সহায়তা দিলেও আবাসন খাত সেই সুবিধা পাচ্ছে না বলে আপনি মনে করেন?

আলী আফজাল: সরকার রুগ্ণ শিল্পের জন্য প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। আগেও এ ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, রুগ্ণ শিল্প রুগ্ণই থেকে যাচ্ছে। এমনকি কিছু ভালো শিল্পও সহায়তা পাওয়ার আশায় নিজেদের রুগ্ণ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতায় যাচ্ছে।

আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও সহায়তার ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছি, আবাসন খাত সেখানে অন্তর্ভুক্ত নেই। এটি আমাদের কাছে বিস্ময়কর। অথচ আবাসন মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বহু সহযোগী শিল্পের বাজার তৈরি করে।

মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে হলে শুধু ক্রেতাদের ঋণ দিলেই হবে না, নির্মাণকারীদেরও সাশ্রয়ী ঋণ দিতে হবে। একদিকে ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদের ঋণ পাবেন, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা কম সুদে অর্থায়ন পাবেন। এ দুই উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে ফ্ল্যাটের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে।

ঢাকা মেইল: ঢাকায় জমির দাম বেশি হওয়ায় ফ্ল্যাটের দামও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকার আশপাশের শহরগুলোকে আবাসনের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ কতটা?

আলী আফজাল: আমরা সবাইকে ঢাকায় নিয়ে আসতে পারব না, আবার সবাইকে ঢাকায় থাকতে হবে, এমনও নয়। মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশে অনেক শহর রয়েছে। এসব এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা গেলে মানুষের থাকার খরচ অনেক কমে আসবে।

একটি ফ্ল্যাটের দামের বড় অংশই জমির মূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। গুলশানের মতো এলাকায় এক কাঠা জমির দাম ১০ কোটি টাকা হতে পারে। অন্যদিকে মানিকগঞ্জের মতো শহরে একই পরিমাণ জমি কয়েক লাখ টাকায় পাওয়া সম্ভব। ফলে পরিকল্পিতভাবে এসব এলাকায় আবাসন গড়ে তোলা গেলে নির্মাণ ব্যয় ও ফ্ল্যাটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে।

এ জন্য আমরা স্যাটেলাইট সিটি বা উপশহর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছি। সরকার জমি অধিগ্রহণ করে পরিকল্পিত আবাসন এলাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা সেই জমি কিনে সেখানে ফ্ল্যাট নির্মাণ করবেন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা তৈরিতে বেসরকারি খাতও ভূমিকা রাখতে পারবে।

তবে শুধু আবাসন তৈরি করলেই হবে না, যোগাযোগব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার আশপাশে ছয়-সাতটি পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তুলে সেগুলোর সঙ্গে মেট্রোরেল বা দ্রুতগতির গণপরিবহনের সংযোগ স্থাপন করতে হবে। মানুষ যেন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় এসে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা দরকার।

এতে ঢাকায় যে দামে ১ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট কেনা কঠিন, আশপাশের কোনো শহরে সেই অর্থে আরও বড় ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মানুষ ভালো পরিবেশে বসবাস করতে পারবেন, আবার ঢাকায় কাজও করতে পারবেন। সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে এই পরিকল্পনায় এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা মেইল: এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

আলী আফজাল: আমাদের দেশে পরিকল্পনার বড় দুর্বলতা হলো, আমরা অনেক ক্ষেত্রেই স্বল্পমেয়াদি চিন্তা করি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময় পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যে প্রথম কয়েক মাস চলে যাওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচনের হিসাব সামনে চলে আসে। তখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে চার বছরের মতো স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কিন্তু একটি দেশের উন্নয়ন এভাবে সম্ভব নয়। আবাসন, নগরায়ণ ও যোগাযোগব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে হবে কয়েক দশক সামনে রেখে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে। তখন বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

তাই এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। কোথায় নতুন শহর হবে, কীভাবে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে, কোথায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কীভাবে আবাসন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা যাবে, এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা মেইল: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নকশা অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়া সহজ করতে আপনাদের দাবি কী?

আলী আফজাল: আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, সরকারকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করতে হবে। একটি বড় আবাসন প্রকল্পের নকশা অনুমোদন পেতে কখনো কখনো এক বছর, দুই বছর, এমনকি তিন বছরও লেগে যায়। বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে একের পর এক স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। এভাবে একটি প্রকল্পের অনুমোদন আটকে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আমি নিজেই প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, রাজউকের সেবার ফি বাড়াতে চাইলে বাড়ান। বর্তমানে যে ফি এক লাখ টাকা, সেটি দুই লাখ টাকা করলেও রাষ্ট্রকে দিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এক লাখ টাকা সরকারি ফি দিতে গিয়ে যদি ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয় এবং দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমরা চাই, আবেদনকারী একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নকশা জমা দেবেন এবং এক মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাবেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অনুমোদন ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আবেদনকারীকে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে হবে কেন?

এ ক্ষেত্রে তিন ধরনের সিদ্ধান্ত হতে পারে। আবেদন আইন অনুযায়ী হলে অনুমোদন দেওয়া হবে। কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে। আর আইন লঙ্ঘন করা হলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে। এতে আমাদের আপত্তি নেই। আমরা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত চাই।

সরকার, রাজউক চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এক মাসে নকশা অনুমোদন এবং ডিজিটাল সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো আমরা সেই সুবিধা পুরোপুরি পাচ্ছি না। আমরা চাই, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হোক।

ঢাকা মেইল: ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে দেরি, প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধা না দেওয়া এবং জমি নিয়ে বিরোধের মতো অভিযোগও রয়েছে। গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় রিহ্যাব কী করছে?

আলী আফজাল: প্রথমেই বলব, রিহ্যাবের বর্তমান প্রায় ২ হাজার সদস্যের সবাই শতভাগ ভালো, এমন দাবি আমরা করি না। সব খাতেই ভালো-মন্দ রয়েছে। আবাসন খাতেও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর, গত ছয় মাসে, এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতা দল গঠন করেছি।

কোনো ক্রেতা প্রতারণার শিকার হলে কিংবা জমির মালিক কোনো সমস্যায় পড়লে অভিযোগের ভিত্তিতে আমাদের মধ্যস্থতা দল ব্যবস্থা নেবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।

তবে এখানে একটি বড় সমস্যা রয়েছে। দেশে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাত থেকে আট হাজার হতে পারে। কিন্তু রিহ্যাবের সদস্য প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯০০। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান আমাদের সদস্য নয়। তাদের কার্যক্রমের ওপর আমাদের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নেই।

আমাদের পর্যবেক্ষণে, সদস্য নয় এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ বেশি পাওয়া যায়। এ জন্য আমরা চাই, আবাসন ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে রিহ্যাবের সদস্যপদ বাধ্যতামূলক করা হোক। যেভাবে তৈরি পোশাকশিল্পে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্যপদ গুরুত্বপূর্ণ, আবাসন খাতেও তেমন জবাবদিহিমূলক কাঠামো প্রয়োজন।

রিহ্যাবের সদস্যপদ থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারব। প্রয়োজনে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নিতে পারব। কিন্তু সদস্য নয় এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।

এ বিষয়ে আমরা গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের প্রস্তাব হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন রিহ্যাবের সদস্যপদ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে আবাসন প্রকল্পের নকশা অনুমোদন না দেয়। এতে ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি বাড়বে এবং গ্রাহক প্রতারণা কমানো সহজ হবে।

ঢাকা মেইল: আবাসন খাতের সঙ্গে কতগুলো সহযোগী শিল্প যুক্ত? কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান কতটুকু?

আলী আফজাল: আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬৯ থেকে ২৭০টি সহযোগী শিল্প যুক্ত রয়েছে। এসব শিল্পের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে আবাসন খাত অন্যতম। আমরা ভালো থাকলে রড, সিমেন্ট, টাইলস, স্যানিটারি সামগ্রী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, আসবাবসহ বিভিন্ন শিল্পের ব্যবসা বাড়ে। আর আবাসন খাত সংকটে পড়লে এসব শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমাদের হিসাবে, আবাসন খাত ও এর সঙ্গে যুক্ত সহযোগী শিল্পগুলো মিলিয়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১৬ শতাংশ অবদান রাখে। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত রয়েছেন।

আবাসন খাত যদি বড় ধরনের সংকটে পড়ে বা কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়, তাহলে এসব মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। এর প্রভাব শুধু আবাসন ব্যবসায়ীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সংশ্লিষ্ট শিল্প, শ্রমিক, সরবরাহকারী ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে। তাই আবাসন খাতকে টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই জরুরি।

ঢাকা মেইল: রিহ্যাবের বর্তমান কমিটির কার্যক্রম নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আলী আফজাল: বিষয়টি কতটা আইনসিদ্ধ এবং কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে একটি বড় ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচিত কমিটি দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে একজন সদস্য মামলা করার পর সংগঠনটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে শুধু রুটিন কাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে আমরা দেখছি।

প্রশ্ন হচ্ছে, একজনের চিঠি বা মামলার ভিত্তিতে একটি নির্বাচিত ট্রেড বডির স্বাভাবিক কার্যক্রম এভাবে সীমিত করা যায় কি না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধিমালা এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আমাদের কমিটির মেয়াদ দুই বছর। নির্বাচিত কমিটির কার্যক্রমে এ ধরনের বাধা তৈরি হলে সংগঠনের পাশাপাশি পুরো আবাসন খাতের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ বিষয়ে আইন ও বিধিমালার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা মেইল: সবশেষে, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আপনার প্রত্যাশা কী?

আলী আফজাল: আবাসনকে শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ। রাষ্ট্রকে নিবন্ধন ব্যয় কমাতে হবে, ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদের গৃহঋণ দিতে হবে, উদ্যোক্তাদের সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং ঢাকার আশপাশে পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে নকশা অনুমোদন ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া ডিজিটাল করতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহক প্রতারণা বন্ধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সরকার নীতিগত সহায়তা দিলে বেসরকারি খাত আবাসন নির্মাণে এগিয়ে আসবে। আমরা চাই, দেশের সাধারণ মানুষ যেন তাদের সামর্থ্যের মধ্যে একটি নিরাপদ ও মানসম্মত বাসস্থান কিনতে পারেন। রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলেই সাশ্রয়ী আবাসনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব।

ঢাকা মেইল: আপানাকে ধন্যবাদ। 
আলী আফজাল: আপনাকেও ধন্যবাদ। 

এমআর/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর