পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রতিবছরই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে নানা আলোচনা ও মতভেদ সামনে আসে। একদিকে এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিবেচিত, অন্যদিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর কিছু আয়োজন নিয়ে প্রশ্নও তোলা হয়। ফলে মুসলিম সমাজের একটি অংশের মধ্যে এ বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বও দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক তাৎপর্য এবং সমসাময়িক বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার (যাত্রাবাড়ী) ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের জেনারেল সেক্রেটারি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা মেইল-এর নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাব্বানি।
‘বাংলা নববর্ষের চেয়ে মুসলমানদের কাছে হিজরি নববর্ষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ’
বিজ্ঞাপন
পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রসঙ্গে ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, পহেলা বৈশাখ মূলত বাংলা নববর্ষের সূচনা দিবস, যা একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার অংশ। তবে মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে হিজরি নববর্ষ, কারণ ইসলামের ইবাদত-বন্দেগী, রোজা, হজ, যাকাতসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ আমল হিজরি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, কেউ যদি বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে অতীতের ভুল-ত্রুটি থেকে ফিরে এসে নতুনভাবে জীবন গঠনের সংকল্প গ্রহণ করেন, তা অবশ্যই ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে নববর্ষ উপলক্ষে অতিরঞ্জন, অশালীনতা বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
‘ঐতিহ্য থাকতে পারে, কিন্তু আকিদা-বিরোধী কিছু গ্রহণযোগ্য নয়’
ড. খলিলুর বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি রয়েছে। ইসলাম এসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে না। তবে যেসব কর্মকাণ্ড মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী, সেসব থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, বাংলা নববর্ষের নামে যদি কেউ অন্যায়, বেহায়াপনা, উশৃঙ্খলতা বা আকিদা-বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ে, তা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না।
‘অশ্লীলতা, আতশবাজি ও উশৃঙ্খলতা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ’
পহেলা বৈশাখের আয়োজনকে ঘিরে কোথাও কোথাও অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, উশৃঙ্খলতা, আতশবাজি কিংবা সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটে থাকে—এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। উৎসবের নামে এসব অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, কোনো উৎসবই এমন হওয়া উচিত নয়, যা মানুষের নৈতিকতা দুর্বল করে বা সামাজিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
‘মুখোশ সংস্কৃতির বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন’
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মুখোশ পরিধানের বিষয়টি নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান ড. খলিলুর রহমান মাদানী। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সেই মানুষ যদি বিভিন্ন প্রাণীর আকৃতির মুখোশ পরে নিজেকে উপস্থাপন করে, তা মানবিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতি তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
‘নতুন বছরে আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার হতে পারে ইতিবাচক উদ্যোগ’
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মুসলিম সমাজের প্রতি করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, এ দিনটিকে আত্মশুদ্ধির একটি উপলক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে অন্যায়-অপরাধ থেকে দূরে থাকার অঙ্গীকার নেওয়া, অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা এবং নৈতিক জীবনযাপনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে।
তিনি বলেন, নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও যেন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়তে দেওয়া হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
‘ইসলাম সামাজিক সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করে না’
যারা পহেলা বৈশাখ পালন করা উচিত কি না—এ নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইসলাম কোনো সামাজিক সংস্কৃতিকে অকারণে নিরুৎসাহিত করে না। বরং সামাজিক রীতিনীতি যদি শরিয়তবিরোধী না হয়, তাহলে তা পালন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, কেউ যদি এ দিনটিকে ইবাদতে অধিক মনোযোগী হওয়ার উপলক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন, সেটিও একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। তবে সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে যেন কোনো অসামাজিক বা অনৈতিক উপাদান যুক্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
‘বাংলা সংস্কৃতি ও ইসলামি সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে’
বাংলা সংস্কৃতি ও ইসলামি সংস্কৃতির সম্পর্ক প্রসঙ্গে ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—সামাজিক রীতিনীতি যদি শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ ও রাসুল (সা.) যেসব বিষয়ে নিষেধ করেননি, সেসব বিষয়ে ইসলামের অনুমোদন রয়েছে।
তিনি বলেন, চুরি, মিথ্যা, ব্যভিচারসহ মৌলিক মানবিক মূল্যবোধবিরোধী কাজ সব ধর্মেই নিষিদ্ধ। ধর্মীয় সংস্কৃতি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য হলেও সামাজিক সংস্কৃতি সবার জন্য উন্মুক্ত।
‘সংস্কৃতি নিয়ে সংঘাত নয়, সচেতনতা প্রয়োজন’
পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক উৎপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দিনকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সামাজিক সংস্কৃতিকে কাউকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কাউকে নিরুৎসাহিত করাও উচিত নয়। এ ধরনের বিষয় নিয়ে সামাজিক বিভাজন বা সংঘাত সৃষ্টি করা অনুচিত।
তিনি আরও বলেন, সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা জরুরি।
‘অপসংস্কৃতি সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ’
উৎসবের নামে অশালীনতা বা অপসংস্কৃতি ঢুকে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করে ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, অনৈতিকতা ও উশৃঙ্খলতা পারিবারিক অশান্তি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। এসব প্রবণতা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে দেয় এবং সমাজের সুস্থ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে উৎসব আনন্দের পাশাপাশি নৈতিকতার পরিবেশও বজায় থাকে।
এমআর/এএস




