মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বেজেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। ইরান বন্ধ করে দিয়েছে হরমুজ প্রণালী, যা দিয়ে দৈনিক প্রায় ৩১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে মাত্র ২০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মূল তেলখাতে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় শঙ্কাগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে আছে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রগুলো।
সংঘাতের প্রভাব পড়ছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর অর্থনীতিতেও। বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই কূটনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করতে শুরু করেছে। এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে বৈশ্বিক ও বাংলাদেশে প্রভাব নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর হাবীব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসাইন।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেইল: যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের কতটুকু ক্ষতি হতে পারে?
তানভীর হাবীব: এই যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর অনেক বেশি পড়বে। জ্বালানি ও রেমিট্যান্সের জন্য বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে গ্যাস ও তেলের দাম বেড়ে যাবে। এতে সব পণ্যের দাম বাড়বে এবং অর্থনীতি সামাল দিতে বাংলাদেশের বাজেটের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হবে।
ঢাকা মেইল: এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে?
তানভীর হাবীব: যুদ্ধের সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। ইরান দীর্ঘমেয়াদি ‘ক্ষয়যুদ্ধ’ (war of attrition) কৌশল অনুসরণ করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দ্রুত সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার কৌশল অনুসরণ করতে পারে। পরিস্থিতি নির্ভর করবে কোন পক্ষ আগে কৌশলগত ছাড় দেয় তার ওপর। কয়েক মাস পর্যন্ত সংঘাত চলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেইল: বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে কেমন?
তানভীর হাবীব: এই সংঘাতের ফলাফলের ওপর বৈশ্বিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করবে। যদি ইরান পরাজিত হয় এবং সেখানে সরকার পরিবর্তন ঘটে, আর রাশিয়া ও চীন তাদের মিত্র ইরানকে কার্যকরভাবে সমর্থন দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে তা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈদেশিক নীতিতে প্রভাব ফেলবে। ইউরোপ হয়তো আরও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে এবং চীন, রাশিয়া ও ব্রিকস দেশগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে কম গুরুত্ব দিতে পারে।
ঢাকা মেইল: এই যুদ্ধ কী কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা সম্ভব বা দুই পক্ষের করণীয় কী হতে পারে?
তানভীর হাবীব: ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে একটি কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ ছিল, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল একটি ‘পছন্দের যুদ্ধ’ (war of choice)। বর্তমানে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা কম। তবে যুদ্ধ যদি অচলাবস্থায় পৌঁছে, তখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো কূটনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে।
ঢাকা মেইল: বৈশ্বিক তেলের বাজারে প্রভাব পড়ছে কেমন?
তানভীর হাবীব: তেলের দাম বাড়ছে এবং ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দাম আরও বাড়তে পারে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ঢাকা মেইল: বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে প্রভাব পড়বে কেমন?
তানভীর হাবীব: মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ, অবকাঠামো ও পর্যটন খাত বড় ধাক্কা খেলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়বে। এর ফলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা মেইল: এই সংঘাত কি দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে?
তানভীর হাবীব: আঞ্চলিক অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তায় প্রভাব পড়তে পারে। এই যুদ্ধ আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছে। বিদ্যমান উত্তেজনা বা সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ নতুন করে সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। সেইসঙ্গে ভারত স্থগিত থাকা ‘অপারেশন সুন্দর’ পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ঢাকা মেইল: বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কী অবস্থান নিতে পারে বা নেওয়া উচিত?
তানভীর হাবীব: এখন পর্যন্ত নেওয়া কূটনৈতিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে বিচক্ষণ। বাংলাদেশ তার আরব মিত্রদের সমর্থন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পায় এবং জ্বালানি সরবরাহও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে বাংলাদেশ খুব বেশি বিকল্পের মুখোমুখি নয়। রেমিট্যান্স ও স্বল্পমূল্যের জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে ফেলার মতো অবস্থায় বাংলাদেশ নেই। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়াই যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত উচ্চকণ্ঠ না হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা বুদ্ধিমানের হতে পারে। যখন যুদ্ধ অচলাবস্থায় পৌঁছাবে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হবে, তখন বাংলাদেশও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যুক্ত হতে পারে। কূটনীতিতে সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমানে দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কম।
ঢাকা মেইল: বাংলাদেশ কীভাবে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে পারে?
তানভীর হাবীব: খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত গড়ে তোলা উচিত। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করা প্রয়োজন, যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা মেইল: বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়তে পারে এবং ডলার সংকট বা রিজার্ভের ওপর চাপ কতটা বাড়তে পারে?
তানভীর হাবীব: জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানি ব্যয় বাড়বে। সরকারকে হয় দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয় করতে হবে, নয়তো ভর্তুকির মাধ্যমে চাপ সামলাতে হবে—দুই ক্ষেত্রেই অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়বে। উচ্চ আমদানি ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে। একই সময়ে রেমিট্যান্স কমে গেলে ডলার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
ঢাকা মেইল: জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী হতে পারে?
তানভীর হাবীব: বড় ধরনের ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা কম। জাতিসংঘকে দুর্বল মনে হচ্ছে। আইএইএর মহাপরিচালকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে অনেকে মনে করেন। ইরান হয়তো এসব সংস্থার ওপর আস্থা রাখবে না। সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান হলে তা বিভিন্ন দেশের উদ্যোগে হবে, যেখানে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন থাকতে পারে।
এসএইচ/এমআর

