বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বৈশ্বিক তাপমাত্রা সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৩, ০৫:১০ পিএম

শেয়ার করুন:

বৈশ্বিক তাপমাত্রা সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা
বিশ্বে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাপমাত্রা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে

অতি উত্তপ্ত এই বিশ্ব আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাপমাত্রা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে ৬৬ শতাংশ।

মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন হচ্ছে এবং চলতি বছরের গ্রীষ্মকালে আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তনের যে শঙ্কা দেখছেন বিজ্ঞানীরা তা থেকেই এ ধরনের কথা বলছেন তারা। যদি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে যায় তা উদ্বেগের, তবে সম্ভবত এটা অস্থায়ী হবে -বলছেন বিজ্ঞানীরা।

২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল দেশগুলো।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি ভালোভাবে বুঝা যাবে।

প্রতি বছর বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে এবং এক বা দুই দশক ধরে এটা চলতে থাকলে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে মারাত্মক প্রভাব দেখা যাবে। যেমন-দীর্ঘ সময় ধরে তাপপ্রবাহ থাকা, মারাত্মক ঝড় ও তীব্র দাবানল দেখা যাবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, কার্বন নির্গমন ব্যাপকভাবে কমিয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি সীমিত রাখার সময় এখনও আছে। এজন্য দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার অর্থ কী?

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই হিসাব সরাসরি কোনো পরিমাপ নয়, দীর্ঘ সময়ের বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ব কী পরিমাণ উত্তপ্ত হয়েছে বা শীতল হচ্ছে -এরকম একটি নির্দেশক এটি।

১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যকার গড় তাপমাত্রার হিসাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে আধুনিক বিশ্ব কয়লা, তেল, গ্যাসনির্ভর হওয়ার আগে অর্থাৎ শিল্পায়ন যুগের আগে বিশ্ব কতটা উত্তপ্ত ছিল।

বিশ্ব উত্তপ্ত হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ গ্রিনহাউজ গ্যাস

গত বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যকার গড় তাপমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রমের অর্থ হলো- ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের তুলনায় পৃথিবী ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণ হয়ে উঠবে।

গত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে বিশ্বের তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমায় পৌঁছে যায়, তাহলে তার ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়বে। কিন্তু ২০১৮ সালে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেই তা বিশ্বের জন্য ভয়াবহ হবে।

গত কয়েক দশক ধরে আমাদের বিশ্ব উত্তপ্ত হচ্ছে। ২০১৬ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ছিল ১.২৮ সেলসিয়াস যা শিল্পায়নের আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল সেই তুলনায় অনেক বেশি।

এখন গবেষকরা বলছেন যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ওই সীমাও ছাড়িয়ে যাবে- তারা ৯৮% নিশ্চিত যে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা সীমা অতিক্রম করবে।

গবেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে আগামী ২০ বছর, প্যারিস চুক্তিতে যেমনটা বলা হয়েছিল।

এল নিনো কীভাবে প্রভাব ফেলবে?

দু’টি মূল উপাদান রয়েছে - প্রথমটি হলো মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে থেকে থেকে ক্রমাগত উচ্চ স্তরের কার্বন নির্গমন। দ্বিতীয় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা হলো এল নিনোর সম্ভাব্য উপস্থিতি। আবহাওয়ায় এল নিনো সক্রিয় থাকলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উষ্ণতা বাড়ে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত তিন বছর ধরে বিশ্ব একটি লা নিনা’র মুখোমুখি হচ্ছে যা জলবায়ু উষ্ণায়নকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বে যে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হবে তার প্রভাবে আগামী বছর উষ্ণতা বাড়বে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এ বিষয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের দীর্ঘকালীন আবহাওয়া পূর্বাভাসের প্রধান অ্যাডাম স্কেইফ সাংবাদিকদের বলেছেন, “ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো আমরা উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির এতো কাছাকাছি রয়েছি”।

“এল নিনোর প্রভাব নিয়ে আমাদের যে পূর্বাভাস, তা শীতকালে দেখা যাবে।"

কিন্তু পাঁচ বছরের সময়ের মধ্যে যা ঘটবে তার সঠিক দিন তারিখ আমরা এখনই দিতে পারব না, এখন থেকে তিন বা চার বছরের মধ্যে এমনটা হতে পারে- এল নিনোর প্রভাবে এমনটা ঘটতে পারে”- বলেন স্কেইফ।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২২–২০২৬ সালের মধ্যে অন্তত একটি বছর বিশ্বের ভূপৃষ্ঠের বার্ষিক তাপমাত্রা শিল্পায়নযুগের আগের সময়ের চেয়ে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হবে।

বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলতে থাকায় অনেক প্রাণীর অস্তিত্ব এখন সংকটের মুখে

সংস্থাটি বলছে - আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কমপক্ষে একটি বছর সবচেয়ে উষ্ণ সময় দেখবে, যা ২০১৬ সালের রেকর্ড ভেঙে দেবে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল প্রফেসর পেট্টেরি তালাস এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবহাওয়ায় এল নিনোর (উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত) প্রভাব শুরু হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে মানুষের নানান কর্মকাণ্ডে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।’

কী প্রভাব পড়বে?

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল তার থেকে বৃদ্ধির মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা গেলে বড় ধরণের বিপদ এড়ানো যাবে। তা না পারলে বিপজ্জনক হয়ে পড়বে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন।

অনেক বিজ্ঞানীর আশঙ্কা যে ভয়ঙ্কর এই পরিণতি ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই। বিশ্বের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে এর প্রভাব বিশ্বের একেক জায়গায় একেক রকম হবে।

ব্রিটেনে বৃষ্টিপাতের মাত্রা প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়ে ঘনঘন বন্যা হবে। সাগরের উচ্চতা বেড়ে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ছোট অনেক দ্বীপ বা দ্বীপরাষ্ট্র বিলীন হয়ে যেতে পারে।

আফ্রিকার অনেক দেশে খরার প্রকোপ বাড়তে পারে এবং পরিণতিতে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় অতিরিক্ত গরম পড়তে পারে এবং খরার প্রকোপ দেখা দিতে পারে।

সূত্র : বিবিসি

এমইউ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর