মুসলিম পরিবারের দানে হয় যে দুর্গাপূজা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:২০ পিএম
মুসলিম পরিবারের দানে হয় যে দুর্গাপূজা
‘কোদাখাকি দুর্গাপূজায়’ সম্প্রীতির চিহ্ন স্পষ্ট

জনশ্রুতি আছে যে প্রায় ৬০০ বছর আগে মুসলিম সম্প্রদায়ের এক সদস্যকে স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিলেন দেবী। আজও ওই নিয়মে ছেদ পড়েনি। দুর্গাপূজার বোধনের আগের দিন দেবীর দর্শন পান কোনো না কোনো মুসলিম পরিবারের সদস্য। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের ‘কোদাখাকি দুর্গাপূজা’ ঘিরে এমনই নানান কাহিনি রয়েছে।

রঘুনাথগঞ্জের লক্ষ্মী জনার্দনপুরের বহুরা গ্রামের স্থানীয় এক বাসিন্দার দাবি, ‘অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। ৫১৯ বছর ধরে এ পূজার বোধনের ঠিক আগের দিন দেবীকে স্বপ্নে দর্শন পায় এলাকার কোনো না কোনো মুসলিম পরিবার।’ দীর্ঘ দিন পূজার সঙ্গে যুক্ত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সদস্য রমেন বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, ‘কোন পরিবার থেকে পূজায় কী দান আসবে, স্বপ্নে তা-ও নির্দেশ দেন মা।’

বস্তুত, ‘কোদাখাকি দুর্গাপূজায়’ সম্প্রীতির চিহ্ন স্পষ্ট। ৫১৯ বছর ধরে পূজার উপাচারেও বদল ঘটেনি। ঐতিহ্য মেনে আজও মুসলিম পরিবারের দেওয়া ভোগ বা কোনো দান প্রথমে দেবীকে উৎসর্গ করা হয়। তারপর অন্যেরা ভোগ ও পূজার দানসামগ্রী উৎসর্গ করতে পারেন দেবীকে।

এ পূজার নামকরণ নিয়েও লোকগাথা রয়েছে। কথিত, এক মহালয়ায় প্রবল বর্ষণে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল এলাকায়। বিঘার পর বিঘা ধানের জমি ডুবে গিয়েছিল। ওই রাতেই এক মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যকে দেবী স্বপ্নে আদেশ দেন যে ভুরুর (কাউন) চালের ভোগ দিতে হবে। সঙ্গে থাকবে কাঁঠাল, ডাঁটা ও গঙ্গার ইলিশ মাছ। প্রসঙ্গত, ভুরুরের আরেক নাম কাউন। তবে প্রাচীনকালে একে কোদা বলেও ডাকা হতো। কোদার চালে দেবীর ভোগ দেওয়া হয় বলে এ দুর্গা ‘কোদাখাকি’ নামে পরিচিত।

রঘুনাথগঞ্জের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আদি নিবাস ছিল সাগরদিঘির মণিগ্রাম। পারিবারিক কারণে দীর্ঘকাল আগে রঘুনাথগঞ্জে চলে আসে এ পরিবার। সে সময় রঘুনাথগঞ্জের জঙ্গলে ঘেরা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ডাকাতদের উপদ্রব ছিলো। গভীর জঙ্গলেই দুর্গাপূজা করত ডাকাতেরা। কথিত, জোতকমলের জমিদার শরৎচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় জমিদারির কাজ সেরে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ওই সময় ডাকাতদের পূজিত মূর্তি দেখতে পান তিনি। রাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পান, তার দেখা ডাকাতের দেবী রূপেই পূজা করতে হবে দুর্গার। অন্য এক কাহিনি অনুসারে, ‘লোকার মা’ নামে এক মুসলিম নারীকে দেবী স্বপ্নের মাধ্যমে ভোগ দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু আর্থিক কারণে তিনি দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সমস্যার সমাধান করে দেন দেবী নিজেই। তিনি নির্দেশ দেন কোদার চালে ভোগ দিতে। আজও কোনো না কোনো মুসলিম রমণী পূজায় দেবীকে শাখা-পলা পরিয়ে যান।

জনশ্রুতি আছে, পূজার আগে কোনো না কোনো মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যকে দেবী স্বপ্নে দর্শন দেন। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সদস্য স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের পুজোর এখনও কিছু রেওয়াজ রয়েছে। বোধনের সময় বলি দিয়ে দুর্গাপূজা শুরু হয়। প্রতিদিন ছাগ বলি দেওয়া হয়। ভোগে কাউনের চাল আবশ্যিক। সন্ধ্যায় কোনো আরতি হয় না। প্রদীপের শিখা উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ঘুরলে সন্ধিপূজা শুরু হয়।’

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

এমইউ