শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ফ্রান্সে বিদেশি ফুড ডেলিভারি কর্মীদের হত্যার হুমকি, আতঙ্কে প্রবাসীরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ফ্রান্সে বিদেশি ফুড ডেলিভারি কর্মীদের হত্যার হুমকি, আতঙ্কে প্রবাসীরা

ফ্রান্সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র ডানপন্থিদের পক্ষ থেকেবিদেশি ও ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ওপর হামলা ও হত্যার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে খাবার সরবরাহকারী বিদেশি ডেলিভারি কর্মীদের লক্ষ্য করে এসব হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে দেশটিতে কর্মরত এসব কর্মীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের নিরাপত্তায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায়, এ খাতের কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের একটি গ্রুপের এক সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে আপনারা ম্যাকডোনাল্ডস বা এ ধরনের খাবার প্রত্যন্ত এলাকায় অর্ডার করেন। এরপর তাদের সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়ে উধাও করে দেন।’

ওই সদস্যের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করেন, ফ্রান্সের বামপন্থি দল লা ফ্রঁন্স আনসুমিজের (এলএফই) সেইন-সাঁ-দনি এলাকার সংসদ সদস্য থমা পোর্ত। 

গ্রুপের আরেক সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘বিষ প্রয়োগ, মেশিনগান দিয়ে গুলি, রাসায়নিক ছিটানো—যা খুশি করুন, কিন্তু আমাদের ভূখণ্ড পুনর্দখল করতে হবে।’

আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা আমার দেশ, এখানে বুনুলদের দেশ নয়’—যা একটি বর্ণবাদী গালি।

২৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংসদ সদস্য এক্সে থমা পোর্ত বলেন, ‘হত্যার আহ্বান, বর্ণবাদী বিদ্বেষে উসকানি এবং বর্ণবাদী বক্তব্যের ঘটনায় আমি অবিলম্বে প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির কাছে অভিযোগ জানাচ্ছি।’

বামপন্থি এই সংসদ সদস্যের অভিযোগ জানানোর বিষয়টি ছাড়াও প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দফতর এ ঘটনায় তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। 

এ বিষয়ে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ফ্রান্সের জাতীয় সংসদে প্রশ্নের মুখে শ্রমমন্ত্রী জঁ-পিয়ের ফারান্দু ঘটনাগুলোর ‘গুরুত্ব’ স্বীকার করেন। তিনি দায়ীদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।

মন্ত্রী বলেন, আমরা ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোকে একত্র করব এবং ডেলিভারিকর্মীদের সুরক্ষায় তারা বাস্তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে, তা জানতে চাইব।

এর আগে শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব বিষয়বস্তুর ‘কঠোর নিন্দা’ জানান। তিনি বলেন, “এই দেশের কোনো কর্মীরই তাঁর কাজের সময় নিজের উৎস, জাতীয়তা, গায়ের রং কিংবা ধর্মের কারণে হুমকি বা হামলার আশঙ্কা নিয়ে কাজ করা উচিত নয়।”

ফরাসি গণমাধ্যম ফ্রান্সইনফোকে উবার জানায়, এ ধরনের বক্তব্যে তারা ‘গভীরভাবে মর্মাহত’। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের সব ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও ডেলিভারিকর্মীকে সতর্কতামূলক বার্তা পাঠানো হয়েছে।

ফ্রান্স ৩ প্যারিস ইল-দ্য-ফ্রঁন্সকে আরেক কোম্পানি ডেলিভেরু জানায়, তারা ‘বিদ্বেষ, সহিংসতা ও বৈষম্যের যেকোনো আহ্বানের কঠোর নিন্দা জানায়’। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, এখন পর্যন্ত এ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ তাদের কাছে জমা পড়েনি।

উবারের মতো ডেলিভেরুও জানিয়েছে, তারা সব ডেলিভারি কর্মীর কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডেলিভারি কর্মীরা চাইলে কোনো অর্ডার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। কোনো হামলা বা বৈষম্যের শিকার হলে কোনো ধরনের পরিণতি ছাড়াই তাঁরা ডেলিভারি বন্ধ করতে পারবেন।

স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলটিকে ডেলিভেরু জানায়, “কোনো ডেলিভারি কর্মী হামলা বা বৈষম্যের শিকার হলে যেকোনো সময় ফোন বা চ্যাটের মাধ্যমে আমাদের নির্দিষ্ট সহায়তা সেবায় যোগাযোগ করতে পারেন। এই সেবা তাঁর অভিযোগ গ্রহণ করবে। কর্মী চাইলে মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য তাঁকে বিশেষায়িত সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হবে।”

এ খাতের কর্মীরা কার্যকর ব্যবস্থা চান

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।

প্যারিসে ডেলিভারি কর্মীদের জন্য সহায়তা ও বিশ্রামের জায়গা ‘মেজো দে কুরসিয়ে’-এর সহ-সমন্বয়ক সির্সে লিয়েনার বলেন, প্ল্যাটফর্মগুলো কর্মীদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে কোনো অর্ডার প্রত্যাখ্যান করলে দুই চাকার যানবাহনে কাজ করা ডেলিভারি কর্মীদের বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। পরবর্তী অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন, এমনকি তাদের অ্যাকাউন্টও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

সির্সে লিয়েনার বলেন, ‘কোনো অর্ডার প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হলো আয় হারানো। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ডেলিভারি কর্মীদের শাস্তি দেওয়া হবে না, সে নিশ্চয়তা কীভাবে পাওয়া যাবে?’

ডেলিভারি কর্মীদের পেশাগত অবস্থান অত্যন্ত অনিশ্চিত। বড় শহরগুলোতে এ পেশায় নিয়োজিত অনেকেই ফ্রান্সে অনিয়মিত অবস্থায় রয়েছেন।

হামলার শিকার হলে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করাও তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এর ফলে তাঁদের ফ্রান্স ত্যাগের বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত আদেশ বা ‘ওকিউটিএফ’ পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফ্রান্সের পরিবহন খাতের শ্রমিক সংগঠন সিজিটি ট্রান্সপোর্টের লুদোভিক রিউ বলেন, “শ্রম মন্ত্রণালয় শুধু বিবৃতি দিচ্ছে, তাদের বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলছি। ফরাসি সরকার কী প্রস্তাব দিচ্ছে? গালিগালাজ বা বর্ণবাদী হামলার শিকার হলে ডেলিভারি কর্মীদের কী ধরনের আইনি প্রতিকার রয়েছে? কিছুই নেই। আর ওকিউটিএফের ভয়ে তাঁরা বিচার চাইতে গেলে তাঁদের কী নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে?”

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তাদের সামনে একমাত্র উপায় হলো কাজ না করা, অর্থাৎ কোনো আয় না করা।

প্যারিসের মেয়র কার্যালয়ের নারী-পুরুষ সমতা, অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অর্থনীতি বিষয়ক সহকারী বারবারা গোমেসও ডেলিভারি কোম্পানিগুলোর কাছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সন্দেহজনক অর্ডার বন্ধ করা। যেমন—নির্জন এলাকায় দেওয়া অর্ডার, ছদ্মনামে অর্ডার করা কিংবা নতুন খোলা অ্যাকাউন্ট থেকে আসা অর্ডার। এ ছাড়া কোনো জরিমানা বা পারিশ্রমিক না কেটে ডেলিভারি বাতিলের সুযোগ এবং উপযুক্ত সহায়তা ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থা চালুর দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতে, ডেলিভারি কর্মীদের ওপর বর্ণবাদী হামলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে ২৩ অক্টোবর ত্রাপ শহরে হামলার ঘটনা আগে থেকেই থাকা আশঙ্কার সঙ্গে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্ট

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর