শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট ‘দখল’ করতে চান বিজেপির এমপি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট ‘দখল’ করতে চান বিজেপির এমপি

পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের (আজাদ কাশ্মীর) পাশপাশি বাংলাদেশের নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলও ভারতের দখলে আনার সময় এসেছে বলে দাবি করেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এমপি নিশিকান্ত দুবে।  

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু আজাদ কাশ্মীরের পাশপাশি নোয়াখালী, চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চল পাকিস্তানের কাছে ‘জোরপূর্বক হস্তান্তর’ করেছিলেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন নিশিকান্ত।

দুবের দাবি, এই তিনটি অঞ্চল এক সময় ত্রিপুরার (টিপরা) রাজ্যের অংশ ছিল। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিশিকান্ত দুবে বলেন, “এখন কেবল পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরকে পাকিস্তানের হাত থেকে পুনরুদ্ধারই নয়, বরং নেহরুজি যে অঞ্চলগুলো জোরপূর্বক হস্তান্তর করেছিলেন—সে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর বা সিলেট, যা-ই হোক না কেন—সেগুলোও ফিরিয়ে আনার সময় হয়েছে।”

তৎকালীন ত্রিপুরার রাজা বীর বিক্রম সিং তার রাজ্য নিয়ে আলোচনার বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে প্রশ্ন করেছিলেন উল্লেখ করে নিশিকান্ত দুবে বলেন, “নোয়াখালী, সিলেট ও ​​চট্টগ্রাম বন্দর—এই তিনটি অঞ্চল ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ ছিল। 

ত্রিপুরা আগে 'টিপরা' নামে পরিচিত ছিল। এর রাজা বীর বিক্রম সিং ক্রমাগত নেহরুর সঙ্গে তর্ক করছিলেন এবং প্রশ্ন তুলছিলেন যে, তিনি কীভাবে তার রাজ্য নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। 

তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন: আপনি কীভাবে নোয়াখালীকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে পারেন? কীভাবে সিলেটে গণভোট আয়োজন করতে পারেন? কীভাবে চট্টগ্রামে গণভোট করতে পারেন? এটি আমার রাজ্য। আমিই সিদ্ধান্ত নেব যে এটি ভারতের অংশ থাকবে, পাকিস্তানের অংশ হবে, নাকি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে।”

তিনি আরও বলেন, সর্দার প্যাটেল সেনাবাহিনী পাঠান এবং ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ত্রিপুরা ভারতের অংশ হয়ে ওঠে। মহারানি কাঞ্চন প্রভা ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে 'ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন' বা ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন, যার ফলে ত্রিপুরা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

দুবে অভিযোগ করেন যে, ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে হিন্দুদের ওপর হওয়া সহিংসতার জবাব দেওয়ার পরিবর্তে পণ্ডিত নেহরু মুসলিম লীগকে নিজের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার দাবি, সেই হত্যাকাণ্ডে প্রায় ১০ হাজার হিন্দু নিহত হয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, নেহরুজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয়, কিন্তু তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর, কারণ তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই মুসলিম লীগ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করে।

তিনি বলেন, ১৯৪৬ সালের ১৫ অক্টোবর নোয়াখালিতে—যা ছিল হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা—হিন্দুদের ওপর এক ভয়াবহ গণহত্যা চালানো হয়। মাত্র একদিনেই প্রায় ১০ হাজার হিন্দুকে হত্যা করা হয়। 

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সেখানে যাননি, বরং তিনি এই চিন্তাতেই ব্যস্ত ছিলেন যে, কীভাবে মুসলিম লীগকে তার সরকারের অংশ করা যায়।

দুবে আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কারণেই পুরো উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন থমকে গিয়েছিল। 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “মূলত চট্টগ্রাম বন্দর চলে যাওয়ার কারণেই পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আজ যদি উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে পিছিয়ে পড়া মনে হয়, যদি সেখানে নানা সমস্যা থেকে থাকে, যদি আমরা সেখানকার খনিজ সম্পদ ও গ্যাসকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারি, আর যদি অঞ্চলটি এখনও বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয়—তবে তার একমাত্র কারণ হলো, সেই বন্দরটি এখন আর আমাদের হাতে নেই। এখন সময় এসেছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালি এবং সিলেটকে পুনরায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার।”

সিলেটে গণভোট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বাহারুল ইসলামকে কংগ্রেস পরবর্তীতে রাজ্যসভার সদস্য করেছিল উল্লেখ করে দুবের প্রশ্ন, “নেহরুজি যেকোনো উপায়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে ত্রিপুরার রাজা বা মহারানি যখন ভারতের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরায় যখন দীর্ঘ এক বছর ধরে সংগ্রাম চলল—তখন আপনারা কীভাবে চট্টগ্রাম, নোয়াখালি ও সিলেটের মতো হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে পাকিস্তানের হাতে (যা এখন বাংলাদেশ) তুলে দিলেন? আপনাদের এই অধিকার কে দিল?”

তিনি আরও বলেন, “যিনি সিলেটে গণভোট পরিচালনা করেছিলেন—সেই বাহারুল ইসলামের কথা জানেন কি? কংগ্রেস তাকে রাজ্যসভার সদস্য করেছিল। রাজ্যসভা থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন। হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে অবসর নেওয়ার পর তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হন। সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর নেওয়ার পর কংগ্রেস তাঁকে পুনরায় রাজ্যসভার সদস্য করে।”

বাহারুল ইসলাম 'মুসলিম লিগ রেড আর্মি’-এর সদস্য ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন নিশিকান্ত দুবে। এই বাহিনী নোয়াখালীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং চট্টগ্রাম দখল করা ও সিলেটে গণভোট (রেফারেন্ডাম) পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ত্রিপুরার রাজনৈতিক দল  টিপরা মোথা’র প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা অভিযোগ করেছেন যে, “দেশভাগের সময় আমার ঠাকুমাকে অন্ধকারে রেখে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বিশাল অংশ পূর্ব পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল—এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।”

ত্রিপুরার রাজপরিবারের প্রধান ও আলঙ্করিক রাজা মাণিক্য বলেন, আজ যদি আমাদের সমুদ্রপথে প্রবেশের সুযোগ থাকত, তবে ‘চিকেনস নেক’ (শিলিগুড়ি করিডোর) নিয়ে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা থাকত না। 

তৎকালীন ভারত সরকারের এই কৌশলগত ভুল শুধু ত্রিপুরা বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলেরই নয়, বরং পুরো জাতিরই বড় ক্ষতি করেছে। আমাদের 'গ্রেটার টিপরাল্যান্ড'  আন্দোলনকে প্রায়শই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সবসময়ই ছিল অতীতের ঐতিহাসিক ভুলের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অঞ্চলগুলোকে পুনরায় একত্রিত করা।

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর