শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

নেতানিয়াহু কি ক্ষমতা হারাচ্ছেন? 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

নেতানিয়াহু কি ক্ষমতা হারাচ্ছেন? 

ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও রাজনীতিক গাদি আইজেনকটের প্রতি নেসেটের ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থনের খবর দেশটির ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। এই সমর্থন যদি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সফল হয়, তাহলে দখলদার রাষ্ট্রটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অবস্থান বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। 

আলজাজিরা বলছে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১ জনের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন একটি সংখ্যাগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এই সমর্থন কতটা ঐক্যবদ্ধ, কোন দলগুলো এর সঙ্গে যুক্ত এবং সরকার গঠনের প্রশ্নে তারা কতটা একমত—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নির্বাচনে ধাক্কা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল নেতানিয়াহুর জোট

ইসরায়েলের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ ২৭টি আসন পেয়ে একক দল হিসেবে সর্বোচ্চ আসন অর্জন করলেও তার নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী জোট সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ৫৩টি আসন। অর্থাৎ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে আটটি আসন কম।

অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন চারটি ইহুদি-ভিত্তিক দলের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। পাশাপাশি আরব-নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক জোট পেয়েছে ১৯টি আসন। এই দলগুলোর সমর্থন যুক্ত হওয়ায় আইজেনকটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সুপারিশ জমা পড়ে। 

নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা হলো দীর্ঘদিনের মিত্র অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের (ইউটিজে) অবস্থান। দলটি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কাউকেই সরকার গঠনের জন্য সুপারিশ করেনি।

মূলত অতি-রক্ষণশীল ইহুদি তরুণদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নে নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে দলটির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে তার নেতৃত্বাধীন জোটের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়েছে। 

৬৭ জনের সমর্থনই কি আইজেনকটের প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিশ্চিত করছে?

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ৬৭ জন সদস্য আইজেনকটকে সমর্থন করলেও তাদের সবাই যে তার নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত, বিষয়টি এমন নয়। 

বিশেষ করে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ১৯ জন আইনপ্রণেতা তাকে সমর্থন করলেও আইজেনকট ও নেতানিয়াহু উভয়েই এসব দলের সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের কাছে পাওয়া সুপারিশের সংখ্যা এবং বাস্তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন এক নয়। 

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। 

তিনি জানান, পারস্পরিক রাজনৈতিক ভেটো এবং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে কে সরকার গঠন করতে পারবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি আগামী রোববার (৮ নভেম্বর) সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেবেন, তা ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন। 

এদিকে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আইজেনকটের আলোচনার ক্ষেত্র কিছুটা বিস্তৃত করেছে। 

ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান অতি-রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে অতি-রক্ষণশীলদের নিয়োগসংক্রান্ত আইন নিয়ে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন তিনি। 

এর ফলে ইউটিজের সঙ্গে সমঝোতার একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হয়েছে। তবে দলটির সঙ্গে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। অন্যদিকে শাস পার্টি এখনো প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে। 

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে?

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, নিজের রাজনৈতিক জোটকে আবার সংগঠিত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা। 

দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন সমীকরণ ভেঙে দেওয়া। তিনি এখনো রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং তাঁর দল লিকুদ পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। ফলে তাকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক ভাবার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে আইজেনকটের জন্যও সরকার গঠন সহজ হবে না। প্রেসিডেন্ট তাকে দায়িত্ব দিলেও সরকার গঠনের জন্য তিনি ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন রাজনৈতিক সংকট কিংবা আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। 

ক্ষমতা হারানোর মুখে নেতানিয়াহু?

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো, দীর্ঘদিনের মিত্রদের দূরে সরে যাওয়া এবং আইজেনকটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সুপারিশ—সবকিছুই নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। 

তবে এখনই তার বিদায় নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। কারণ আইজেনকটের সমর্থকরা এখনো একটি কার্যকর সরকার গঠনের প্রশ্নে পুরোপুরি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নির্ভর করবে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা এবং নেসেটে ৬১ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করার ওপর।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলো— নেতানিয়াহু নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে ৬৭ জনের সমর্থন তার রাজনৈতিক বিদায়ের চূড়ান্ত ঘোষণা নয়; বরং ইসরায়েলের ক্ষমতার পালাবদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

আগামী রোববার প্রেসিডেন্ট হারজোগের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী জোট আলোচনা নির্ধারণ করবে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটছে, নাকি তিনি আবারও ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ খুঁজে পাচ্ছেন।

সূত্র: আলজাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর