কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ থেকে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাককে ছাড় দিয়েছে ইরান। এই চার দেশের জাহাজ প্রণালিটি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে এই ছাড়ের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ, কূটনৈতিক সমর্থন এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত-মোকাদ্দাম ইরানি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এসব দেশের জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও সেগুলোকে বাধা দিচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের এই সিদ্ধান্তের পেছনে দেশগুলোর সঙ্গে পৃথক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। ভারত থেকে ওষুধ আমদানি, চীনের রাজনৈতিক সমর্থন এবং কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা তেহরানের এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভারতের কাছ থেকে ওষুধ, চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন
ইরানি আইনপ্রণেতা হায়াত-মোকাদ্দাম জানিয়েছেন, ভারতের জাহাজ চলাচলে ছাড় দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশটি থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানি করা। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারত ওষুধ উৎপাদন ও রফতানিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হওয়ায় তেহরান এ সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে।
অন্যদিকে চীনের জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে দেশটির রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশা করছে ইরান। চীন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
হায়াত-মোকাদ্দাম জানিয়েছেন, ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ইরান ট্রানজিট ফি বা চলাচল ফি আদায় করবে। তবে কাতারের জাহাজকে বিনা শুল্কে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে কোনো ফি নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও মানবাধিকার অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী গবেষক এবং ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক রুজবেহ পারসি আলজাজিরাকে বলেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের জন্য পণ্য বিনিময় ও পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক বাণিজ্য নতুন কিছু নয়। তবে এবার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা এড়িয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা আনা-নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, জাহাজগুলোকে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে ইরান সম্ভবত ট্রানজিট ফি অথবা পণ্যবাহী জাহাজের পণ্যমূল্যের একটি অংশ আদায় করছে।
অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ইরানের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জন্য?
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথের ওপর চারটি দেশই বিভিন্ন মাত্রায় নির্ভরশীল। ফলে প্রণালিতে বিধিনিষেধ তাদের জ্বালানি সরবরাহ, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের ওপর এশিয়ার দেশগুলোর নির্ভরতা অনেক বেশি। ফলে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ চলাচলের সুযোগ পাওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা।
জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মিউ সু আলজাজিরাকে বলেন, গত অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেল উপসাগরীয় অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় দেশটি বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ইরানের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কাতারের ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে দেশটি। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে কাতার এ প্রণালি দিয়ে কোনো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করতে পারেনি। তবে অক্টোবরে দেশটি ১৮ লাখ টন এলএনজি পরিবহন করেছে।
একই সময়ে কাতারের অপরিশোধিত তেল পরিবহন প্রতিদিন ৫ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল থেকে কমে ১ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেলে দাঁড়ায়। বিপরীতে ইরাকের তেল পরিবহন প্রতিদিন ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল হয়েছে।
কূটনৈতিক হিসাবও রয়েছে
ইরানের সিদ্ধান্তকে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
বিশ্লেষক রুজবেহ পারসির মতে, ভারত ও কাতারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান নিয়েও কিছুটা হতাশ। কাতারের জন্য ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভৌগোলিকভাবে দেশটি ইরানের প্রতিবেশী।
চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা চীনের রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দেওয়া ছাড় গ্রহণ করলে বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য রাজনৈতিক মূল্যও বিবেচনা করতে হবে।
ইরাকের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষক পুস্তাই। ইরান ও ইরাক উভয় দেশই শিয়াপ্রধান জনগোষ্ঠীর দেশ এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কি এড়িয়ে যেতে পারবে জাহাজগুলো?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, ইরান ছাড় দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধের বিষয়টি আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকা বা বন্দর থেকে প্রবেশ কিংবা বের হওয়া সব দেশের জাহাজের ওপর অবরোধ প্রযোজ্য। তবে ইরানের বন্দর ব্যবহার না করে চলাচলকারী জাহাজগুলো এই অবরোধের আওতায় পড়বে না। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী জাহাজ পরিদর্শনের পর চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।
বিশ্লেষক পুস্তাইয়ের মতে, ইরানের ঘোষণা অনুযায়ী ছাড় যদি শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য করা জাহাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তাহলে এর প্রভাব সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের ওপরও পড়তে পারে।
তবে জাহাজের জাতীয়তা নির্ধারণের বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট। কোনো জাহাজের পতাকা, মালিকানা, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাকি অন্য কোনো সম্পর্কের ভিত্তিতে ছাড় দেওয়া হবে, তা পরিষ্কার করেনি তেহরান।
ইরানের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে দুর্বল করতে পারে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে কতটা প্রভাব পড়বে?
বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত এই ছাড় বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে না।
আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, বর্তমানে বাজারে যুদ্ধের অবসান ও শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সংঘাত আবার তীব্র হলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এমনকি ইরানের ছাড় পাওয়া দেশগুলোর জাহাজও যে পুরোপুরি নিরাপদ, তার নিশ্চয়তা নেই।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) এবং যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবর মাসে হামলার ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি।
সূত্র: আলজাজিরা
এমএইচআর




