ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাতটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছে নিরাপত্তা আতঙ্ক। যুক্তরাজ্য, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও বুলগেরিয়াগামী উড়োজাহাজগুলোতে তল্লাশি চালিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কোথাও উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন, কোথাও জরুরি অবতরণ এবং যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে তল্লাশিতে কোনো উড়োজাহাজেই বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন, নাকি ইউরোপের আকাশপথে চলাচল ব্যাহত করার কোনো সমন্বিত চেষ্টা, তা খতিয়ে দেখছে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ।
রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরের সূত্র জানিয়েছে, বেনামি তথ্য পাওয়ার পর রায়ানএয়ারের দুটি উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো হয়। এর একটি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন এবং অন্যটি পর্তুগালের লিসবন থেকে ছেড়ে গিয়েছিল। উড়োজাহাজ দুটি রোমে অবতরণের পর তল্লাশি করা হলেও কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
ডাবলিন থেকে আসা উড়োজাহাজটিকে অবতরণ পর্যন্ত পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে ইতালির বিমানবাহিনী। এ ছাড়া পোল্যান্ড, স্পেন ও বুলগেরিয়াতেও উড়োজাহাজে তল্লাশি চালিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। তবে এগুলো আকাশপথে চলাচল ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে সমন্বিত হামলার চেষ্টা কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে কাজ করছে।
যুক্তরাজ্য সরকার ঘটনাগুলোকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুয়া হুমকি’ বলে বর্ণনা করেছে। এক বিবৃতিতে সরকার বলেছে, সম্ভাব্য যেকোনো হুমকি এবং এ ধরনের ভুয়া হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরীক্ষিত প্রক্রিয়া রয়েছে যুক্তরাজ্যের।
বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পল ম্যাসন বলেন, যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি খুব বেশি দেখা যায় না। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিমান সংস্থার উড়োজাহাজে বিশ্বাসযোগ্যভাবে এসব হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমার ধারণা, এটি কোনো একক পক্ষের পরিকল্পিত কাজ; বিচ্ছিন্ন কিছু অসৎ ফোনকলের ঘটনা নয়।’
ম্যাসন বলেন, হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে উড়োজাহাজের ভেতরে থাকা ক্রু এবং মাটিতে দায়িত্ব পালন করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বেশ কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছালে উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাটিতে দায়িত্ব পালনকারীরা কী পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন, তা উড়োজাহাজের ক্রুদের জানানোও হয় না বলে জানান তিনি।
রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরের সূত্র জানিয়েছে, যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। যাত্রী, লাগেজ ও উড়োজাহাজে তল্লাশি চালিয়ে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। পরে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মুরসিয়ায় অবতরণ করা ম্যানচেস্টার থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি উড়োজাহাজেও কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। উড়োজাহাজটির এক যাত্রী পরে জানান, অবতরণের আগপর্যন্ত তিনি বোমা হামলার হুমকির বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
সারা নামের ওই যাত্রী বলেন, ‘পুরো উড়োজাহাজ যাত্রায় আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। হঠাৎ উড়োজাহাজটি থেমে যায়। এরপর প্রায় ৩০ মিনিট আমাদের রানওয়েতে অপেক্ষা করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘উড়োজাহাজটি থামার এক মিনিটও হয়নি, এর মধ্যে চারপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, পুলিশ ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল চলে আসে। এরপর আমাদের উড়োজাহাজ থেকে নেমে যেতে বলা হয়।’
যাত্রীদের সব জিনিসপত্র উড়োজাহাজে রেখেই পুলিশ তাদের বাইরে নিয়ে যায়। পরে তাদের জানানো হয়, উড়োজাহাজটিকে লক্ষ্য করে সত্যিকারের বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশগামী দুটি উড়োজাহাজেও এমন হুমকি আসে। এর মধ্যে একটি ছিল লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া উড়োজাহাজ।
হিথ্রো থেকে আসা উড়োজাহাজটির গন্তব্য ছিল ওয়ারশর প্রধান বিমানবন্দর শপিন। তবে সেটিকে অন্য একটি ছোট বিমানবন্দর মডলিনে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য মডলিন বিমানবন্দর বন্ধ রাখতে হয়।
অন্যদিকে, ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে ওয়ারশ-শপিনগামী স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ নির্ধারিত সময়েই অবতরণ করে।
মঙ্গলবার পরে বুলগেরিয়ার পরিবহনমন্ত্রী জর্জি পিভ জানান, দেশটির রাজধানী সোফিয়াগামী দুটি উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বিএটিএকে তিনি বলেন, উড়োজাহাজ দুটি এসেছিল উত্তর ইতালির বার্গামো শহর ও আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন থেকে।
তবে উড়োজাহাজ দুটির গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়নি। তল্লাশি চালিয়েও কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
বুলগেরিয়ার সীমান্ত পুলিশ বিবিসিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে তারা একটি ই-মেইল পায়। এতে বার্গামো থেকে আসা একটি উড়োজাহাজে ‘বিস্ফোরক ডিভাইস থাকার’ কথা বলা হয়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ ধরনের ঘটনার জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা হয়। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জরুরি সমন্বয়কেন্দ্র গঠন করা হয়।’
সীমান্ত পুলিশ আরও জানায়, একই ই-মেইলে ডাবলিন থেকে আসা আরেকটি উড়োজাহাজেও একই ধরনের হুমকির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সূত্র: বিবিসি।
এমআর




