রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জেন-জি বিক্ষোভে ফের উত্তাল ইউরোপ, ৪ দেশে ব্যাপক সংঘর্ষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ এএম

শেয়ার করুন:

জেন-জি বিক্ষোভে ফের উত্তাল ইউরোপ, ৪ দেশে ব্যাপক সংঘর্ষ
ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষা খাত থেকে শুরু করে আবাসন সংকটের মতো নানা সমস্যা নিয়ে ইউরোপজুড়ে রাজপথে নেমেছেন তরুণরা। জেন-জি বা জেনারেশন-জির এই আন্তঃপ্রজন্মীয় ক্ষোভ এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভ এখন ইউরোপের একাধিক দেশের সরকারগুলোর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

প্যারিস থেকে বার্লিন কিংবা ওয়ারশ—এক রাতে তিন দেশের রাজপথ যেন রূপ নিল রণক্ষেত্রে। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়, সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি আর তরুণদের উপেক্ষা করার ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ইউরোপজুড়ে আবার ফুঁসে উঠেছেন জেন-জি’রা।

হ্যালোইন উদযাপনের মধ্যে গতকাল শনিবার রাতে ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘাত, জার্মানিতে নজিরবিহীন লুটপাট ও পেট্রলবোমা হামলা এবং পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্ত করাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে শহরে শহরে ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনাও ঘটেছে।

ফ্রান্স

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ ঘিরে বিক্ষোভ মিছিলের পর রাজধানী প্যারিসসহ নানা শহরে সংঘর্ষ হয়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এ সময় দেশজুড়ে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি ব্যয় কমানোর চাপের মুখে পড়েছে মাখোঁর সরকার। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের হাতে বিকল্প কমে আসছে।

গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলগুলোর বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে প্যারিসে মিছিলের শেষ দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালায়। লিওঁ ও তুলুজ শহরেও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এ ছাড়া মার্সেই শহরে মিছিলের শেষ দিকে উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে রাত বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।

ফ্রান্সে গত ১৭ অক্টোবর দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর তৃতীয় সপ্তাহের মতো এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো। ওই দিন দেশজুড়ে বিভিন্ন দোকান, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। তবে আগের দুই শনিবারের তুলনায় গতকাল বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কম ছিল। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এদিন দেশজুড়ে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
 
ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার দিন দিন অবনতি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রথমে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় শ্রমিক সংগঠনগুলো। নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনও। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে তারাও বিক্ষোভে শামিল হয়।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি ব্যয় কমানোর চাপের মুখে পড়েছে ম্যাক্রো সরকার। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের হাতে বিকল্প কমে আসছে।

জার্মানিতেও বিক্ষোভ

জার্মানির কয়েকটি শহরেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দোকানে লুটপাট চালান। জার্মানিজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বড় ধরনের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর এ ঘটনা ঘটল।

এ সময় পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

জার্মানির বিভিন্ন শহরে ১০ হাজারের বেশি তরুণ এ বিক্ষোভে অংশ নেন। ‘জেনজি রেগেল্ট!’ নামের একটি সংগঠন এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তরুণদের উদ্বেগ ও দাবির প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের মনোযোগ দিতে হবে।

প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনেগালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তবে মাঝপথে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফেরেন।
দিনভর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও সন্ধ্যায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তরুণেরা বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে চাইলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গসহ বড় শহরগুলোয় সংঘর্ষ ঘটে।

ফ্রাঙ্কফুর্টে পরিস্থিতি ছিল বেশি খারাপ। সেখানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর, আতশবাজি ও পেট্রলবোমা ছোড়েন। জবাবে পুলিশ জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, সেখানে ‘সহিংস দাঙ্গা’ হয়েছে। বিভিন্ন দোকানের কাঁচ ভাঙচুর করা হয়েছে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করেও পেট্রলবোমা ছোড়া হয়েছে। লুটপাট চালানো হয়েছে।

পোল্যান্ড

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, দেশের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে তার সরকার। এ আদালতের প্রধানের অব্যাহতির প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো শত শত মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর এ কথা বলেন তিনি।

পোল্যান্ডের সরকারি কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আদালতের প্রধানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া দরকার। তবে বিরোধীপক্ষের সমালোচকেরা সরকারের এ পদক্ষেপকে ‘অভ্যুত্থান’ বলেছেন।

প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনেগালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তবে মাঝপথে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফেরেন। শুক্রবার রাতের বিশৃঙ্খলার মধ্যেই তিনি সাংবিধানিক আদালত ভবনে যান।

পোল্যান্ডের ইউরোপপন্থী সরকারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত কারোল নাওরোকি সেখানে বলেন, দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া আদালতপ্রধানকে ট্রাইব্যুনাল ভবনে ঢুকতে সহায়তা করেছেন তিনি।

ইতালি

ইতালিতেও শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো, সরকারি সেবা জোরদার করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিবাদও জানিয়েছেন এই বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভের বড় একটি অংশজুড়ে ছিলেন শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরা।  এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে

এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর