বিশ্বজুড়ে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ের ঋণ বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি করেছে নতুন চাপ। বিশেষ করে ঋণের সুদ মেটাতে স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমাচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট ঘাটতির প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই কিছু জায়গায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু এখন ফ্রান্স। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত শনিবার দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।
এসব বিক্ষোভের জেরে ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বছরের পর বছর বিপুল ঋণ নেওয়ায় দেশগুলো এখন তীব্র ঋণভারে জর্জরিত।
বর্তমানে বৈশ্বিক ঋণের চিত্র, সরকারগুলোর ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং ফ্রান্সসহ শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর তথ্য তুলে ধরেছে আল জাজিরা।
কোন দেশের কত ঋণ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সরকারি ঋণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশের সমান।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটির সরকারি ঋণ প্রায় ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণ প্রায় ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি— প্রায় ১৯৯ শতাংশ।
বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাজ্য চতুর্থ। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশের সমান।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে দেশটি বিশ্বে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। দেশটির ঋণ জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশের সমান।

অন্যদিকে ইতালির সরকারি ঋণ প্রায় ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও জিডিপির তুলনায় এর অনুপাত ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে অষ্টম অবস্থানে আছে ভারত, যা দেশটির মোট জিডিপির ৮৩ শতাংশ।
কানাডার সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে দেশটি বিশ্বে নবম অবস্থানে রয়েছে। দেশটির ঋণ জিডিপির ১১৬ শতাংশের সমান।
দশম অবস্থানে থাকা ব্রাজিলের সরকারি ঋণ প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট জিডিপির ৯৭ শতাংশ।
এদিকে বৈশ্বিক ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা জিডিপির ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
আইএমএফ বলছে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। তবে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ঋণ ও জিডিপির অনুপাত এখনো তুলনামূলক কম।

সরকার কীভাবে ঋণ করে?
সরকারও মানুষের মতোই ঋণ গ্রহণ করে, তবে ব্যাংকে যাওয়ার পরিবর্তে তারা বন্ড বিক্রি করে। এর বিনিময়ে সরকার ক্রেতাদের সুদ প্রদান করে এবং একটি নির্দিষ্ট তারিখে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়।
যেমন— ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের অর্থ সরকার ১০ বছর পর ফেরত দেয়। এ বন্ডের ‘ইল্ড’ বা মুনাফার হার দিয়ে বোঝা যায় বিনিয়োগকারীরা ঋণ দিয়ে কতটা আয় করছেন। মূলত একটি দেশ তার ঋণ সামাল দিতে পারবে কিনা, সেই বিষয়ে আর্থিক বাজারের আস্থা পরিমাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।
বিনিয়োগকারী যদি ১০০ ইউরো দিয়ে ১০ বছর মেয়াদি বন্ড কেনেন এবং সুদের হার ৫ শতাংশ হয়, তবে তিনি প্রতিবছর ৫ ইউরো করে ১০ বছরে ৫০ ইউরো সুদ পাবেন। মেয়াদ শেষে তিনি মূল ১০০ ইউরোও ফেরত পাবেন।
ঋণ গ্রহণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে গেলে কী হয়?
ঋণের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঋণ গ্রহণের খরচ। ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেড়ে গেছে। দেশটি ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের বিপরীতে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। একই মেয়াদের জার্মান বন্ডের সুদের হার প্রায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও বর্তমানে ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেশি।
বন্ডের সুদের হার বাড়লে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। বন্ডের দাম কমে গেলে সাধারণত এর ফলন বা ইয়েল্ড বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বেশি ঝুঁকি দেখলে সেই দেশকে ঋণ দেওয়ার জন্য তুলনামূলক বেশি সুদ দাবি করতে পারেন। ফলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ঋণের এই চাপ সামাল দিতে দেশটির সরকারকে বাজেট ঘাটতি কমানো এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বৈশ্বিক ঋণের এই সংকটের প্রভাব শুধু সরকারগুলোর বাজেটেই সীমাবদ্ধ নয়। সুদের হার বাড়লে বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদও বেড়ে যেতে পারে। এতে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ভোগ ও বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারের ক্ষেত্রেও সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো শিক্ষা, হাসপাতাল, সড়ক, পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য তুলনামূলক কম অর্থ হাতে থাকা। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে কর বাড়াতে, উন্নয়ন ব্যয় কমাতে কিংবা নতুন ঋণ নিতে হতে পারে।
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৪৪ হাজার ডলার। বৈশ্বিক ঋণের সাম্প্রতিক বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।
আইআইএফ বলছে, ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি সুদের ব্যয়ও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। এই অর্থ বিশ্বের সামরিক খাতে ব্যয় হওয়া ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যয় হওয়া ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় হওয়া ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএইচআর




