আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে রিপাবলিকান পার্টি যখন চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে ট্রাম্প বলেছেন, শিগগিরই প্যারিস একটি মুসলিম শহরে পরিণত হবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ক্যানসাসে এক জনসভায় ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ ও কড়া সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টরা মিলে ফ্রান্সকে দখল করছে, লুটপাট চালাচ্ছে, পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। আমাদের দেশে আমরা এমনটা ঘটতে দেব না।
তিনি আরও বলেন, ফ্রান্সে যা ঘটছে, তার সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক রয়েছে; শিক্ষাব্যবস্থা বা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
চলমান পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁসহ ইউরোপের নেতাদের সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
দিনের শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে পুরোনো এক কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে ট্রাম্প বলেন, তাকে আমি অনেক আগেই বলেছিলাম, আপনারা ফ্রান্সে বড় ভুল করছেন। সারা দুনিয়ার মানুষকে আপনারা দেশে ঢুকতে দিচ্ছেন; প্যারিস খুব শিগগিরই মুসলিম শহরে পরিণত হতে যাচ্ছে।
এর আগে সোমবার ৮০ বছর বয়সি এই প্রেসিডেন্ট তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘অভিবাসীরা ফ্রান্স দখল করে নিয়েছে। তাদের অবশ্যই সীমান্ত বন্ধ করতে হবে, দ্রুত!’
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শনিবারে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে অনেক জায়গায় এই বিক্ষোভ লুটপাট ও সহিংস সংঘাতে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সোমবার দেশটিতে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে।
শনিবারের ওই বিক্ষোভে দুই হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য আহত হন।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের আঘাতে এক বিক্ষোভকারীর হাত উড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সের এ বিক্ষোভ মূল্যস্ফীতির কারণে শুরু হলেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সহিংস সংঘর্ষকে নিজের অভিবাসন-বিরোধী নীতির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন ট্রাম্প। এই অভিবাসন-বিরোধী নীতিকে পুঁজি করেই তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান মার্শাল ফান্ড-এর সিনিয়র ফেলো জে সি লিন্টজেনিখ এএফপিকে বলেন, তারা ফ্রান্সের এই সংকটকে নিজেদের নির্বাচনি প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে জনমত জরিপগুলোতে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক পার্টি অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।
মার্কিন নাগরিকদের ভোটগ্রহণের মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি থাকতে ভোটারদের রিপাবলিকান পার্টি ও নিজের মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন (মাগা) আন্দোলনের পক্ষে টানতে ট্রাম্প সম্ভাব্য সব কৌশলই আঁকড়ে ধরছেন।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ের অধ্যাপক জাস্টিন ভাইস এএফপিকে বলেন, মাগা আন্দোলনের শুরু থেকেই ইউরোপকে মার্কিন রাজনৈতিক লড়াইয়ের বর্ধিত ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই ১৭ অক্টোবরের অস্থিরতার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে যে তাদের রাজনৈতিক যন্ত্রের চাকা সচল হয়ে উঠবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ফ্রান্সের অস্থিরতার ভিডিওগুলো যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন শনিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এক্স-এ লেখেন, ‘পশ্চিমা উদারপন্থিরা তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের ফ্রান্সে ডেকে এনেছে...; মূলধারার সমাজের সঙ্গে তাদের খাপ খাওয়ানো এবং সামঞ্জস্যের মৌলিক প্রশ্নগুলোকে তারা পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।’
গ্লেন বেক, বেনি জনসন, নিক সর্টর ও জ্যাক পোসোবিয়েকের মতো মার্কিন ডানপন্থি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরাও একই সুরে কথা বলেছেন। পশ্চিমা আত্মপরিচয়ের এ সংকটের জন্য তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের দায়ী করেছেন।
ভ্যান্স বলেন, সার্বিকভাবে অভিবাসন এবং বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসন— যদি আদৌ আলাদা করে এমন কিছু থেকে থাকে— তার বিরুদ্ধে যেসব সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, এই দাঙ্গাকে সেগুলোরই বাস্তব প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এর সিনিয়র পলিসি ফেলো এবং সংস্থাটির প্যারিস কার্যালয়ের প্রধান সিলিয়া বেলিন মনে করেন, ইউরোপের জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া মার্কিন প্রশাসনের এই মন্তব্যগুলো মূলত তাদের ‘অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ’।
তিনি এএফপিকে বলেন, পরিস্থিতি আরও ‘উসকে দিতে’ ট্রাম্প ও তার মিত্ররা তড়িঘড়ি করে এমন মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে চাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে গত শনিবার প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে এসব বিক্ষোভ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দেশটির অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনায় রূপ নেয়।
প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী , গত শনিবারের বিক্ষোভে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। অনেক শহরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও সম্পদ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মুখোশ পরা দাঙ্গাকারীরা বিভিন্ন পৌর ভবন, পুলিশ স্টেশন ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার স্থানীয় সময় গভীর রাতে ফ্রান্সের বিভিন্ন বড় শহরে আংশিক কারফিউ জারির ঘোষণা দেয় দেশটির সরকার। গত কয়েকদিনের সহিংস বিক্ষোভ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর এমন জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনে জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারাভিযানে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোকে অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প। সেই সময় তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে এমন কিছু দাবি করেছিলেন, যেগুলো সত্য ছিল না এবং যা জাতিগত ভীতিকে উসকে দিয়েছিল।
সূত্র: এএফপি, এনডিটিভি
এফএ




