মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও জ্বালানি রফতানি চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। গত জুলাই থেকে দেশটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিপিং গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের তথ্যের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ওমান উপকূলে অন্য দেশের জাহাজের আড়ালে জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি স্থানান্তরের মাধ্যমে এসব চালান পাঠানো হচ্ছে।
জাহাজ চলাচল ও স্যাটেলাইটের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সংস্থা ইউনাইটেড এগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান (ইউএএনআই) জানিয়েছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ইরানের অন্তত আটটি এলপিজিবাহী ট্যাঙ্কার ওমান উপসাগর অতিক্রম করেছে। এসব জাহাজে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল এলপিজি ছিল। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে ইরানের জেট ফুয়েলবাহী একটি ট্যাঙ্কার মিয়ানমারে পৌঁছানোর তথ্য স্যাটেলাইট চিত্রে পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলোর অধিকাংশের ওপরই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে ইরানের অপরিশোধিত তেল রফতানি সেপ্টেম্বরে শূন্যে নেমে আসার পর দেশটি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পরিশোধিত জ্বালানি রফতানির বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। ছোট জাহাজ ব্যবহার এবং সমুদ্রে জ্বালানি স্থানান্তরের কৌশলের মাধ্যমে এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তাদের নৌ অবরোধ কার্যকরভাবে কাজ করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত তিন মাসে মার্কিন বাহিনী ১৩৫টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে এবং চারটি জাহাজ অচল করে দিয়েছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চলমান সংঘাতের প্রভাবে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দেশটির বিমান সংস্থাগুলোর পাশাপাশি তাদের সেবা দেওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। এর ফলে দুবাই, আজারবাইজান, জর্জিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইরাকসহ বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সাধারণ ইরানি নাগরিক ও প্রবাসীদের যাতায়াতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আগে তেহরান থেকে প্রায় দুই ঘণ্টায় ১০০ থেকে ২০০ ডলার খরচে দুবাই যাওয়া সম্ভব হলেও সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় এখন বিকল্প পথে ইস্তাম্বুল হয়ে যাত্রা করতে হচ্ছে। এতে ভ্রমণে সময় লাগছে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত, আর টিকিটের দাম ছাড়িয়ে যাচ্ছে এক হাজার ডলার। জরুরি চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে যাতায়াতকারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এদিকে আর্মেনিয়ায় আয়োজিত একটি প্রকৃতি সম্মেলনে অংশ নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে সামরিক আগ্রাসনের কারণে প্রকৃতির যে ক্ষতি হচ্ছে, তা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে স্থলবাহিনী পাঠানো কিংবা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা তার নেই। তবে ‘মাদার অব অল বম্বস’ (এমওএবি) নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অ-পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা স্পষ্টভাবে নাকচ করেননি।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় পারস্য উপসাগরে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। একটি সিঙ্গাপুরের কনটেইনার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আগুন ধরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জাহাজটি ডুবে যায়।
অন্যদিকে, ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামি-নিয়া দাবি করেছেন, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে। সম্প্রতি একাধিক মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি রপ্তানির বিকল্প পথ খুঁজছে ইরান। একই সময়ে বিমান যোগাযোগে বিপর্যয় এবং পারস্য উপসাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
/এএস




