ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ঘোষিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর থেকেই দিল্লিতে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের করা হয়েছে। বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড, মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ এবং বিক্ষোভকারীদের আটক করার জন্য নির্ধারিত কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে এত আয়োজনের মধ্যেও ককরোচ জনতা পার্টি ও তাদের সমর্থকদের কর্মসূচি কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

২০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী, কঠোর নজরদারি
বিক্ষোভের আগে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে যন্তর মন্তর, কেন্দ্রীয় দিল্লি, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং রাজধানীতে প্রবেশের পথগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে আবেদন জমা পড়ে ৭ অক্টোবর, অর্থাৎ ঘোষিত বিক্ষোভের মাত্র তিন দিন আগে। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মসূচির জন্য অন্তত ১০ দিন আগে জানানো প্রয়োজন।
ইন্ডিয়া টুডে বলছে, নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যারিকেড, নজরদারি ক্যামেরা এবং আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য নির্ধারিত আটক কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধ
সিজেপির বিক্ষোভের আগে সবচেয়ে সরকারের আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি হলো মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ৯ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে শনিবার ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত জনপথ–কর্তব্যপথ সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের নির্ধারিত এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের আশঙ্কা, বিক্ষোভের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন যোগাযোগ ব্যবহার করে দ্রুত লোকসমাগম ঘটানো কিংবা উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে।

মেট্রো-রেল চলাচলে বিধিনিষেধ
বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও কড়াকড়ি আরোপের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দিল্লিগামী কিছু ট্রেনের চলাচল বাতিল বা নিয়ন্ত্রণের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, পুলিশের অনুরোধে শুক্রবার রাত ৯টা থেকে ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ বিধিনিষেধ বহাল থাকতে পারে।
প্রভাবিত স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে- রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, নয়াদিল্লি, প্যাটেল চক, জনপথ, মান্ডি হাউস, আইটিও, দিল্লি গেট, খান মার্কেট, কাশ্মীরি গেট, হাউজ খাস ও লাজপত নগর। এসব স্টেশন দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
মেট্রোর পাশাপাশি রেল পরিষেবাতেও প্রভাব পড়েছে। শুক্র ও শনিবার নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা ২৫০টিরও বেশি ট্রেন ও লোকাল ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

যন্তর মন্তরে সাত স্তরের ব্যারিকেডিং
যন্তর মন্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং বিক্ষোভস্থলের দিকে যাওয়ার রাস্তা বরাবর অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। ব্যারিকেডগুলো ভাঙা আরও কঠিন করার জন্য শেষের কয়েকটি স্তর ঝালাই করে একসাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
সংবেদনশীল স্থানগুলিতে লাউডস্পিকার স্থাপন করা হয়েছে এবং রেকর্ড করা ঘোষণার মাধ্যমে জনগণকে জানানো হচ্ছে যে প্রস্তাবিত বিক্ষোভের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি। ঘোষণাগুলিতে জনগণকে বিক্ষোভের জন্য সমবেত না হতে, স্লোগান না দিতে, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি না করতে বা পুলিশ সদস্যদের উপর হামলা না করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
কী অপেক্ষা করছে ককরোচ পার্টির জন্য?
১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অনুমতি না পাওয়া সত্ত্বেও ককরোচ জনতা পার্টি ও তাদের সমর্থকেরা যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারবেন কি না। কঠোর নিরাপত্তা, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা, বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি এবং পরিবহনসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে শুক্রবার রাতে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, সরকারের এই সব বিধিনিষেধ সত্ত্বেও স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকেরা যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচির পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাবেন।
এক এক্স বার্তায় তিনি বলেন, ‘একদিকে আপনারা বলছেন বিক্ষোভের কারণে অসুবিধা হবে। অন্যদিকে আপনারা মেট্রো, রেললাইন বন্ধ করে দিয়েছেন এবং রাস্তা অবরোধ করেছেন। এতে কি অসুবিধা হবে না?’
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করলেই যে বিক্ষোভ পুরোপুরি ঠেকানো যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আন্দোলনকারীরা অন্য স্থানে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন কি না, পুলিশ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবং বিরোধী দলগুলো কতটা সক্রিয় থাকে—এসব বিষয় পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সূত্র: এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টুডে, দ্য প্রিন্ট
এমএইচআর




