শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

আফগানদের ফেরত পাঠাতে তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় ফ্রান্স

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

আফগানদের ফেরত পাঠাতে তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় ফ্রান্স

অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আফগান নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ফ্রান্স। ফরাসি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির একটি কূটনৈতিক সূত্র।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কূটনৈতিক সূত্রটি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, ‘অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতো ফ্রান্সও জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আফগান নাগরিকদের সরাসরি আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে তালেবানের সঙ্গে কারিগরি আলোচনা শুরু করেছে।’’

সূত্রটি আরও জানায়, ‘ফরাসি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।’

তবে এই আলোচনা আফগানিস্তান নিয়ে ফ্রান্সের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটাচ্ছে না বলে জানিয়েছে সূত্রটি। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তাদের সঙ্গে ফ্রান্সের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কাবুলে ফ্রান্সের দূতাবাসও এখনো বন্ধ রয়েছে।

এদিকে জার্মানি, বেলজিয়াম ও সুইডেনের পাশাপাশি ফ্রান্সও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রায় ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আফগান নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার পক্ষে। বিশেষ করে মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকা কিংবা অন্যদের ওপর সহিংসতার দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মূলত বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এবং আদালতে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থিতি বাড়াতে চায় তালেবান

তালেবানের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে প্যারিসে অবস্থিত আফগানিস্তান দূতাবাসের একটি সূত্র।

সূত্র জানায়, ‘তালেবানের সঙ্গে আলোচনা সম্পর্কে আমাদের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য জানানো হয়নি। তবে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ আদালতে দণ্ডিত আফগান নাগরিকদের তালিকা আমাদের কাছে পাঠায়। যাতে কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য কনস্যুলার ছাড়পত্রের আবেদন করতে পারে। আমরা এসব ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিই এবং এরপর ছাড়পত্র দিই। এই প্রক্রিয়ার পর তাদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হয় কি না, তা আমরা জানি না।’

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে তালেবান কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে।

এদিকে, চলতি বছরের গ্রীষ্মে জার্মানি ঘোষণা দিয়েছিল, আফগান নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘কারিগরি’ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে তালেবান সরকারের প্রতিনিধিদের দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

জার্মান সরকারও তালেবানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে কাবুলে আফগান নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে বার্লিন। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নথি তৈরির ক্ষেত্রে তালেবানের সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তালেবান প্রতিনিধিদের জার্মানিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমালোচনার মুখে পড়ে। 

এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানায়, নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে আসা প্রতিনিধিরা জার্মানিতে স্বীকৃত কূটনীতিক নন। অর্থাৎ, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দুই পক্ষের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট জুলাইয়ের শেষ দিকে জানিয়েছিলেন, আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম আর শুধু অপরাধী ও ‘সম্ভাব্য সন্ত্রাসীদের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ফলে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া অন্যান্য আফগান নাগরিককেও কাবুলে ফেরত পাঠানো হতে পারে।

তালেবান সরকারের প্রতিনিধিদের ফ্রান্সে আসার মাধ্যমে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সহজ করার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, এ বিষয়ে এএফপির প্রশ্নের জবাব দেয়নি ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর কতজন আফগান নাগরিক এই উদ্যোগের আওতায় পড়তে পারেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানাতে রাজি হয়নি কূটনৈতিক সূত্রটি।

ফ্রান্সে আসতে পারেন তালেবান প্রতিনিধিরা?

ফ্রান্সে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, এই উদ্যোগের আওতায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ পড়তে পারেন। তাদের সংখ্যা ‘কয়েক শ’ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রটি আরও জানিয়েছে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে।

এর আগে গত জুনে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তালেবান প্রতিনিধিদের একটি বৈঠকও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বামপন্থী আইনপ্রণেতারা এ বৈঠকের সমালোচনা করেন।

তাদের অভিযোগ, ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর তালেবান সরকার ইসলামি আইনের কঠোর সংষ্করণ ও ব্যাখ্যা প্রয়োগ করছে এবং নারী ও মেয়েদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এমন একটি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ফ্রান্স ও তালেবানের মধ্যে এই আলোচনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিবাসন সংস্থা ফ্রান্স তের দাজিল (এফটিডিএ)-এর মুখপাত্র মায়েল লেনা।

ফরাসি গণমাধ্যম ফ্রান্স ইনফোকে তিনি বলেন, ‘এটি একেবারেই মর্যাদাহানিকর। এটি এমন একটি দেশ, যেখানে নারীরা এখন তাদের অধিকাংশ অধিকার থেকে বঞ্চিত। ১২ বছর বয়সের পর তাদের পড়াশোনার অধিকার নেই। পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য ছাড়া রাস্তায় বের হওয়ারও অনুমতি নেই।’

আফগান নারীরা বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধের মুখে রয়েছেন। তাদের অনেকেই বিভিন্ন পেশায় কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে অধিকাংশ জনসাধারণের ব্যবহারের স্থানেও তাদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। ১২ বছর বয়সের পর মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগও বন্ধ রয়েছে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেসকো) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানে প্রায় ২৪ লাখ কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

২০২৪ সালে তালেবান সরকার আফগান নারীদের ওপর আরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর আওতায় জনসমক্ষে গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি করা, এমনকি উচ্চস্বরে পড়ে শোনানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

‘আফগান শরণার্থীদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়দাতা ফ্রান্স’

ফ্রান্স থেকে যেসব আফগান নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ চললেও ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আফগান জনগণের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ফ্রান্সের সরকার এখনো দেশটিতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। একই সঙ্গে নিজ দেশে হুমকির মুখে থাকা আফগান নারী ও পুরুষদের আশ্রয়ের অধিকার অনুযায়ী ফ্রান্সে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।

ফ্রান্সের অভিবাসন ও সংহতি দপ্তরের (অফি) মহাপরিচালক দিদিয়ের লেসচি ২০২৫ সালের জুনে বলেছিলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে সিরিয়ার সংকট, উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর সীমান্ত বন্ধের নীতি এবং আফগান সরকারের পতনের পর ফ্রান্স আফগান শরণার্থীদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়দাতা দেশে পরিণত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালে ফ্রান্সে এক লাখের বেশি আফগান নাগরিক অবস্থান করছিলেন। তাদের এই অভিবাসন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা, যার ব্যাপকতা ছিল অপ্রত্যাশিত।’

অন্যদিকে, জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার আফগান নাগরিক বসবাস করছেন।

সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস 


এমএইচআর

 

 

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর