বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

দিল্লিতে আন্দোলনের নতুন মুখ কে এই নেহা বোরা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

দিল্লিতে আন্দোলনের নতুন মুখ কে এই নেহা বোরা?

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নতুন মুখ সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সভাপতি নেহা বোরা।

নির্বাচন কমিশনারে পদত্যাগ, অবৈধভাবে বিজেপির ক্ষমতায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলা এবং সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে চলা সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন নকশালপন্থি দল সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন বা আইসার সভাপতি নেহা বোরা। খবর বিবিসির।

তার এই যাত্রা শুরু হয় চলতি বছর জুলাই থেকে। ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট'-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস মামলায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশনরত অভিজিৎ দীপকে ও সোনম ওয়াংচুকের পাশাপাশি আরও একটি মুখ নজর কেড়েছিল। 

তিনি ছিলেন নেহা বোরা, যিনি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই প্রতিবাদের সমর্থনে তার কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে অনশন যুক্ত হয়েছিলেন।

নেহা বোরা যে মূল পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই সিপিআই (এমএল) লিবারেশন পার্টির ভারতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ছয়। এর মধ্যে দুজন বিহারের ও দুজন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের বিধায়ক। এবং আরও দুজন বিহারের কারাকাট ও আরা সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সসদ্য।

যদিও ছাত্র সংগঠন আইসা ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি করে থাকে।

সিজেপি আন্দোলনের পরে ফের আলোচনায় আসেন যখন তিনি ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে রাঁচিতে পৌঁছেছিলেন।

neha

সেই সময়ে তার মুখে কালি ছুড়ে মারা হয়। কিন্তু বোরা বলেন, মুখে কালি ছুড়ে মারলে আমি ভয় পাওয়ার মানুষ নই। দিল্লির আন্দোলনের সময়ে আমি প্যালেট গান এবং লাঠিচার্জেরও মুখোমুখি হয়েছি।

তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তারা কি মনে করেন, কালি ছুড়ে মেরে সারা দেশের ছাত্র-যুবদের ক্ষোভকে দমিয়ে রাখা যাবে?

এরপর তিনি বিহারে গিয়ে সিজেপির বিক্ষোভের সময়ে গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেন। গত কয়েক বছর ধরে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় নেহা বোরা এখন দেশের চলমান যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন।

তার দৃঢ় অবস্থান, স্পষ্টভাষী বক্তৃতা এবং লড়াকু মনোভাবের কারণে নেহা বোরা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তৃতার একাধিক রিল ভাইরাল হয়েছে।

এখন নেহা বোরা আবার দিল্লিতে তার সমর্থকদের নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন।

এবার তিনি এবং তার সমর্থকেরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মাঠে নেমেছেন। একাধিক বিরোধী দলের অভিযোগ, দেশে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের জন্য জ্ঞানেশ কুমার দায়ী এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারিয়েছেন।

সম্প্রতি ইংরেজি সংবাদপত্র 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' তাদের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছিল যে, এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।

nha

নেহা উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা। তিনি প্রথমে দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, দিল্লি থেকে এমএ সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেএনইউ-তে বামপন্থি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ নেহা বোরা। তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।

বর্তমানে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গণআন্দোলন ও বামপন্থি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে ক্রমশ উঠে আসছেন।

গত মাসে ফ্রন্টলাইন পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বোরা বলেছিলেন, যন্তর-মন্তরেও বিপুল সংখ্যক পোস্টার লাগানো হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল, 'আপনারা গডসেকে বিশ্বাস করেন, আমরা ভগৎ সিংকে বিশ্বাস করি। এটাই আপনার এবং আমার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য, আর সেই কারণেই আপনাদের ক্ষমতা ছাড়তে হবে।' মানুষ বারবার বলছিল যে, যারা গডসেকে বিশ্বাস করে, তারা এই দেশ শাসন করবে না।

তিনি আরও বলেছিলেন, এখানে আরএসএস-এর সেই সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছিল, যা দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

নেহা বোরা এমন একটি পরিবারে জন্ম নিয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির সমর্থক। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমার নিজের পরিবারেই বিজেপির কট্টর সমর্থক রয়েছেন এবং আমাদের বাড়িতে এ নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য ছিল। আমি যখন থেকে দিল্লিতে এসেছি এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছি, তখন থেকেই বাড়িতে এই মতপার্থক্য চলছে।

নেহা বোরার মতে, সিজেপি আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণ প্রজন্ম এই আন্দোলন থেকে শিখেছে যে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে একে অপরের জন্য লড়লে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তিনি চান, যন্তর-মন্তর আন্দোলন থেকে যে শক্তি ও উদ্দীপনার জন্ম হয়েছে, তা যেন এসআইআর, নির্বাচনক্ষেত্র পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন), শ্রমিকদের অধিকার এবং নারীদের সংরক্ষণের মতো অন্যান্য বিষয়ক আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ে।

তার কাছে এই আন্দোলন গণতন্ত্র এবং দেশের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর সংগ্রামের একটি অংশ।

গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি আলোচনা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেহা বোরার তুলনা করে মানুষ বিতর্ক শুরু করেছেন, যে কে বেশি 'ম্যাচিউর'।

এক্স-এ এক ইউজার, অ্যামক, নেহা বোরার ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন, ম্যাচিউরিটি হলো, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে নেহা বোরা অভিজিৎ দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান। তিনি জেন-জি প্রজন্মের একেবারে আইকন, আর তার স্টাইল ও ব্যক্তিত্ব দুর্দান্ত।

এই পোস্টটি পুনরায় শেয়ার করে অভিজিৎ দীপকে নিজেই লিখেছিলেন, আমি এর সঙ্গে একমত। এই পোস্টের কিছুক্ষণ পরই নেহা এক্স-এ লিখেছিলেন, তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি। এর জবাবে অভিজিৎ লিখেছিলেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

সিজেপি-র আন্দোলনের সময়ে যন্তর-মন্তরে এক বিক্ষোভে বক্তৃতা দিতে গিয়ে নেহা বোরা নিজেও বলেছিলেন যে দীপকে বিনয়ী, অন্যদের পরামর্শ গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকেন এবং তিনি আন্দোলনকারীদের এই উপলব্ধি করিয়েছেন যে, তিনিও তাদের মতোই এই সংগ্রামের এক ছাত্র ও সহযোদ্ধা। গোটা ভারতে এখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পোস্টারগার্ল নেহা বোরা।

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর