যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয়দের—বিশেষ করে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অনলাইনে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্সে’ দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে ঘৃণামূলক পোস্টের মাসিক সংখ্যা ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ২৪০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে মাসিক ঘৃণামূলক পোস্টের সংখ্যা ১২ হাজার ৯০৪ থেকে বেড়ে ৪৩ হাজার ৮৪৩-এ পৌঁছেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা- সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ) প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে। গবেষণাটির নাম দেওয়া হয়েছে- ‘যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়বিরোধী বিদ্বেষের ক্রমবর্ধমান ঢেউ’।
গবেষণায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ‘এক্স’-এ দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ৫ লাখ ৪২ হাজারের বেশি ঘৃণামূলক পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে গবেষণার শেষ ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক পোস্টের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল।
গবেষকরা জাতিসংঘের নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুসরণ করে ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য’ চিহ্নিত করেছেন। জাতি, বর্ণ, জাতীয়তা, ধর্ম, বংশপরিচয় কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আক্রমণাত্মক, অবমাননাকর বা বৈষম্যমূলক ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে কি না, সেটিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ঘৃণামূলক পোস্টের বড় একটি অংশে দক্ষিণ এশীয়দের যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘চাকরি কেড়ে নেওয়া জনগোষ্ঠী’ অথবা দেশটির জনমিতিক পরিবর্তনের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অভিবাসন, কর্মসংস্থান এবং দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ ভিসা কর্মসূচিকে ঘিরে বিতর্কের সঙ্গেও এসব বক্তব্যের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
ভারতীয়রা এসব আক্রমণের অন্যতম বড় লক্ষ্য বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ ভিসাধারীদের বড় অংশ ভারতীয় হওয়ায় প্রযুক্তিখাতের চাকরি ও অভিবাসন নিয়ে অনলাইন বিতর্কে ভারতীয়দের আলাদাভাবে টার্গেট করা হচ্ছে বলে গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তবে শুধু ভারতীয় নয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিরাও এসব আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
গবেষকেরা বলছেন, অনলাইনে ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের প্রায়ই একই ধরনের একটি গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রেও হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও খ্রিস্টানদের আলাদা পরিচয় উপেক্ষা করে তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে।
দক্ষিণ এশীয়দের ‘অপরিচ্ছন্ন’ বা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ‘এক্স’-এ এ ধরনের বর্ণনামূলক আক্রমণ ১৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শুধু ‘এক্স’ নয়, আরও কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে মোট প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫২২টি বিদ্বেষমূলক উল্লেখ পাওয়া যায়। এর বড় অংশই একটি নির্দিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়েছিল।
এদিকে অনলাইন বিদ্বেষের সঙ্গে বাস্তব জীবনের হয়রানি ও সহিংসতার সম্পর্ক নিয়েও গবেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভারতীয়, মুসলিম ও শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলার কয়েকটি ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য ও আইনি অবস্থান আলাদা হওয়ায় সেগুলোকে সরাসরি অনলাইন বিদ্বেষ বৃদ্ধির ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি ছবি ও ভিডিও দক্ষিণ এশীয়দের নিয়ে বর্ণবাদী ও অমানবিক ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়দের ঘিরে অনলাইন বিদ্বেষ এখন শুধু অভিবাসন বা চাকরির বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জাতিগত পরিচয়, ধর্মীয় বিভাজন।
সূত্র: আলজাজিরা, টাইমস অব ইন্ডিয়া
এমএইচআর




