বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

কুখ্যাত ‘মার্কিন গোয়েন্দাকে’ আটকে রাখতে পারল না ভারত!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ পিএম

শেয়ার করুন:

কুখ্যাত ‘মার্কিন গোয়েন্দাকে’ আটকে রাখতে পারল না ভারত!

ভারতে আটক কুখ্যাত সিআইএ এজেন্ট ম্যাথু ভ্যানডাইক এবং তার ছয় ইউক্রেনীয় সহযোগিকে অবশেষে মার্কিন চাপে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো দিল্লি।

চলতি বছরের ১৩ মার্চ কলকাতা বিমানবন্দরে তাদের ইউএপিএ-র ১৮ ধারার (সন্ত্রাসদমন আইন) অধীনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। দিল্লির একটি আদালত তদন্তে সহযোগিতার শর্তে তাদের এক মাসের জন্য নিজের নিজের দেশে ফেরার আবেদন মঞ্জুর করেছে।

কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া মার্কিন ভাড়াটে সৈন্য ম্যাথু ভ্যানডাইক-সহ ছয় বিদেশিকে শর্তসাপেক্ষে নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে দিল্লির এক আদালত। তিহার জেল থেকে এক মাসের জন্য নিজেদের দেশে ফেরার ছাড়পত্র পেয়েছেন ভ্যানডাইক ও ছয় ইউক্রেনীয়।

গত সপ্তাহের শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দিল্লির একটি আদালত ভ্যানডাইক ও ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিককে এক মাসের জন্য নিজ নিজ দেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তবে আদালত শর্ত দিয়েছে, তদন্তের প্রয়োজনে তাদের তলব করতে পারে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এনআইএ)। তাদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তদন্তে অংশ নিতে হবে।

court

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ভ্যানডাইক গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। ২১ অক্টোবর ভারতে ফেরার জন্য ইতিমধ্যেই ফিরতি বিমানের টিকিট বুক করেছেন। 

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পর্যটক ভিসা নিয়ে ভারতে পা রাখেন এই মার্কিন এই গোয়েন্দা। সেই ভিসা নিয়েই ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এই সাত জন। ভারতীয় আইন অনুযায়ী, পর্যটক ভিসা নিয়ে ঘুরতে এলে দেশের কিছু নির্দিষ্ট অংশে যেতে হলে সরকারের বিশেষ অনুমতি নিতে হয়।

এই সাত জন সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই চলে যান মিজোরামে। সেখান থেকে বেআইনি ভাবে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে। 

সীমান্ত পারাপারেরও কোনও বৈধ নথি ছিল না ভ্যানডাইক ও তার সঙ্গীদের হাতে। উত্তর-পূর্বে জঙ্গি নাশকতায় জড়িত সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে সেখানে পৌঁছে যান তারা।

মিজোরাম দিয়ে চোরাপথে মিয়ানমারে ঢুকে সেখানকার কুকি চিন বিদ্রোহীদের ড্রোন প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক হাতিয়ার সরবরাহের মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে এই সাত বিদেশির বিরুদ্ধে। 

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়া এই এই সাত জন বিদেশির সন্দেহজনক কার্যকলাপ নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। ওই কার্যকলাপ বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের আওতায় পড়তে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখছে এনআইএ।

ভ্যানডাইককে চলতি বছরের ১৩ মার্চ কলকাতা বিমানবন্দরে গ্রেফতার করা হয়েছিল। একই দিনে দিল্লি এবং লখনউ বিমানবন্দর থেকে ছয় ইউক্রেনীয় হুরবা পেট্রো, তারাস সিলভিয়াক, ইভান সুকমানোভস্কি, মারিয়ান স্টেফানকিভ, মাকসিম হনচারুক এবং ভিক্টর কামিনস্কিওকে ধরা হয়। 

কিন্তু সন্ত্রাসদমন আইন প্রয়োগ না করে তাঁদের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট’ (অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক বিষয়ক আইন)-এর অধীনে অভিযুক্ত করা হয়।

দিল্লির একটি আদালত তদন্তে সহযোগিতার শর্তে তাদের এক মাসের জন্য নিজ নিজ দেশে ফেরার আবেদন মঞ্জুর করেছে। আদালত তাদের এক মাস পর ভারতে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছে। দেশে ফেরার পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আদালতকে তা জানানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালতের বিশেষ বিচারক প্রশান্ত শর্মার এজলাসে এনআইএ-র তরফে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। সেই চার্জশিট জমা পড়তেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন বহু আইন বিশেষজ্ঞ এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। 

কারণ উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সাত জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসদমন আইন প্রয়োগ না করে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট’ (অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক বিষয়ক আইন)-এর অধীনে মামলা করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।

us-ind

অথচ এফআইআরে ভ্যানডাইক-সহ সাত জনের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র ১৮ নম্বর ধারা প্রয়োগ করেছিল এনআইএ, যে ধারা সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

ফলে, পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে ভিন্ন আইনে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এনআইএ-র তদন্ত প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে ওয়াকিবহাল মহলে।

তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ফাঁকফোকর থাকার অভিযোগ উঠতে না উঠতেই আদালতের রায় নতুন এক বিতর্কে উস্কে দিয়েছে। বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করছেন ভ্যানডাইক-সহ ছয় বিদেশির ভারতে ফেরত আসার সম্ভাবনার গুড়ে বালি। 

কারণ অতীতে এ ধরনের বহু ঘটনাই ঘটেছে যেখানে মামলায় অভিযুক্তেরা আর ভারতে ফেরেননি। ভ্যানডাইকের মতো গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্তকে কীভাবে তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল তা নিয়ে এনআইএ-র অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বলে দাবি।

কে এই ভ্যানডাইক? কেন তার সাময়িক মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন। তবে কি এই মার্কিন নাগরিকের মুক্তির জন্য বিশেষ উৎসাহী মার্কিন সরকার? নেপথ্যে কারণ কী?

kuki

২০১১ সালে প্রথম বার খবরের শিরোনামে আসেন ভ্যানডাইক। সেই সময় লিবিয়ায় শুরু হয়ে গিয়েছিল গৃহযুদ্ধ। বিদ্রোহীদের হয়ে লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিলেন এই মার্কিন ভাড়াটে যোদ্ধা। তবে নিজেকে তথ্যচিত্র নির্মাতা, কখনও আবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং যুদ্ধ প্রতিবেদক হিসাবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন ভ্যানডাইক।

এক পর্যায়ে ত্রিপোলির সরকারি বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হন তিনি। ২০১১ সালের ২৪ অগস্ট অন্য বন্দিরা তার সেলের তালা ভেঙে ফেললে তিনিও কারাগার থেকে পালিয়ে যান। 

lybia

মুক্তি পাওয়ার পর ভ্যানডাইক ‘সন্স অফ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল’ বা ‘সোলি’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় বিদ্রোহীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়াই এই সংস্থার প্রধান কাজ।

রুশ গোয়েন্দাদের দাবি, সিরিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত ছিলেন ভ্যানডাইক। তার গতিবিধির উপর দীর্ঘ দিন ধরেই নজর রাখছিল মস্কো। মার্কিন ভাড়াটে ফৌজির পা ভারতে পড়তেই নয়াদিল্লিকে সতর্ক করে ক্রেমলিন। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয় এনআইএ।

ম্যাথুর জীবনকাহিনির সবচেয়ে আকর্ষণীয়, আবার একই সঙ্গে জটিল দিকগুলোর একটি হল সিআইএ-র সঙ্গে তার যোগ থাকার জল্পনা। তিনি জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে ‘সিকিউরিটি স্টাডিজ’ বা নিরাপত্তা বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। 

তার এই শিক্ষাগত ও পেশাগত পটভূমির কারণেই সিআইএ-র সঙ্গে তার কোনও ধরনের যোগাযোগ ছিল কি না, তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হয়েছে। আর এই যোগসূত্র নিয়েই চিন্তিত ভারতের গোয়েন্দারা।

তাদের দাবি, ভ্যানডাইক হলেন আমেরিকার ‘ধুরন্ধর’। নিজেদের ‘এজেন্ট’কে দেশে ফেরাতে তৎপর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। সেই সূত্রেই কেউ কেউ তাকে আমেরিকার ‘গোপন এজেন্ট’ বলেও দাবি করছেন। 

তাদের বক্তব্য, ভ্যানডাইককে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা মহলে তৎপরতা রয়েছে এবং তার বর্তমান পরিস্থিতির পিছনেও সেই যোগাযোগের কোনও ভূমিকা থাকতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ভারতের উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সেখানে নজর পড়েছে আমেরিকার। উত্তর-পূর্ব ভারতে পৃথক ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ তৈরিতে উস্কানি দেওয়া চীনের নাকের ডগায় পাহাড়ঘেরা এলাকায় সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার ছক ওয়াশিংটনের বহু দিনের। 

cia-2

প্রতিরক্ষা মহলের দাবি, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যদি কোনও স্বাধীন ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ গড়ে ওঠে, তাহলে নিরাপত্তার জন্য সেই নতুন রাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের উপর নির্ভর করতে হতে পারে।

তাদের যুক্তি, সীমিত সম্পদ নিয়ে চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর সামনে একটি নতুন রাষ্ট্রের পক্ষে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সেখানে মার্কিন সামরিক পরিকাঠামো বা ঘাঁটি তৈরির সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করেন। 

তাই ভাড়াটে সৈন্য পাঠিয়ে সেখানকার বিদ্রোহীদের ড্রোন প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক হাতিয়ারে অভ্যস্ত করানোর চেষ্টা করছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।

তাদের যুক্তি, সীমিত সম্পদ নিয়ে চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর সামনে একটি নতুন রাষ্ট্রের পক্ষে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সেখানে মার্কিন সামরিক পরিকাঠামো বা ঘাঁটি তৈরির সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করেন। 

gua2

তাই ভাড়াটে সৈন্য পাঠিয়ে সেখানকার বিদ্রোহীদের ড্রোন প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক হাতিয়ারে অভ্যস্ত করানোর চেষ্টা করছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।

অভিযুক্ত ভ্যানডাইকের পক্ষের আইনজীবী রোহিত দান্দ্রিয়াল ও রোহিত গৌর আদালতে উপস্থিত হয়ে ১৮ সেপ্টেম্বরের আপস নিষ্পত্তির পরিপ্রেক্ষিতে অভিবাসন ও বিদেশি আইনের অধীনে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অপরাধগুলো থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে।

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর