জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলোতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি কোন পথে প্রবাহিত হবে এবং কোথায় সবচেয়ে বেশি জমতে পারে, তা আগেই শনাক্ত করতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন প্রকৌশলীরা।
‘অ্যাডভান্সড ক্যাচমেন্ট মডেলিং’ নামে পরিচিত এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারী বৃষ্টির সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানির প্রবাহ ও সম্ভাব্য জলাবদ্ধতার চিত্র তৈরি করা হচ্ছে। এতে বন্যার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত অটডেস্ক ইউনিভার্সিটি ২০২৬-এর এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান অটডেস্কের সিনিয়র প্রোডাক্ট ম্যানেজার ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ সামের মুহান্দেস।
তিনি বলেন, শহরে অতিবৃষ্টির প্রভাব মোকাবিলা এখন শুধু বৃষ্টি থামার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কখন, কোথায় এবং কীভাবে পানি প্রবাহিত হবে, তা আগেই হিসাব করে অবকাঠামো প্রস্তুত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের ১৪ থেকে ১৬ এপ্রিলের ভয়াবহ বৃষ্টিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও আশপাশের দেশগুলোতে ব্যাপক আকস্মিক বন্যা হয়। ওই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে গত ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়। কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে ২৫৯ দশমিক ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়।
দুবাইয়ে একদিনেই প্রায় দেড় থেকে দুই বছরের গড় বৃষ্টিপাতের সমপরিমাণ বৃষ্টি হয়েছিল। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ওমানে আকস্মিক বন্যায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়।
মুহান্দেসের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের শহরগুলোতে ভারী বৃষ্টির সময় দুটি বড় সমস্যা তৈরি হয়- বিপুল পরিমাণ পানি এবং সেই পানি সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিদ্যমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা।
হঠাৎ অল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টি হলে প্রচলিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা অনেক সময় তা সামাল দিতে পারে না। বৃষ্টি থেমে গেলেও পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য দুর্ভোগ চলতে থাকে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোথায় পানি জমছে, কীভাবে সেখানে পৌঁছাচ্ছে এবং কোন পথে প্রবাহিত হচ্ছে- এসব তথ্য সংগ্রহ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি আগেই বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ‘টাইম-স্টেপ ফোরকাস্টিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি ঝড়ের বিভিন্ন সময়ে শহরের কোন এলাকায় কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার পূর্বাভাসও দেওয়া সম্ভব।
দ্রুত নগরায়ণও বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন মুহান্দেস। মরুভূমির প্রাকৃতিক মাটি বৃষ্টির পানি শোষণ করতে পারলেও সেখানে ভবন, সড়ক, কংক্রিট ও অ্যাসফল্টের বিস্তার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে দিচ্ছে।
তার ভাষায়, প্রাকৃতিক মরুভূমি অনেকটা ‘স্পঞ্জের’ মতো কাজ করে। নগরায়ণের ফলে সেই প্রাকৃতিক শোষণক্ষমতা কমে গিয়ে পানি দ্রুত নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়। এতে অতিরিক্ত পানি জমে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ সমস্যা মোকাবিলায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগেই তার সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ‘ডেট্রিমেন্ট অ্যান্ড বেটারমেন্ট অ্যানালাইসিস’ এর মাধ্যমে নতুন ভবন, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও সড়ক নির্মাণে প্রাকৃতিক পানি শোষণের কতটা পরিবর্তন হবে এবং কোথায় অতিরিক্ত পানি জমতে পারে, তা হিসাব করা হচ্ছে।
এরপর টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি সরানোর টানেল কিংবা বড় আকারের জলাধারের মতো সম্ভাব্য সমাধানগুলো কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে পরীক্ষা করে বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা তুলনা করা হচ্ছে।
বন্যার ঝুঁকি কমাতে বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি ছোট ছোট পরিবর্তনও কাজে আসতে পারে। সড়কের মাঝের অংশে ফাঁকযুক্ত ইট ব্যবহার করলে বৃষ্টির পানি ধীরে ধীরে মাটিতে প্রবেশের সুযোগ পায়। একইভাবে পরিকল্পিত সবুজ এলাকা ও মোটা নুড়িপাথর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাণিজ্যিক ভবনের ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করেও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, সংগৃহীত পানি শৌচাগারে ব্যবহারের কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে পরিশোধিত পানির ব্যবহার কমানো সম্ভব।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে পানির গুরুত্ব বিবেচনায় বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার এসব উদ্যোগ একই সঙ্গে বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং পানির অপচয় রোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: আরব নিউজ




