প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের নতুন অভিযোগ ওঠায় আবারও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। বিশ্বের কথিত সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের অন্যতম বিশ্বস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত তিন সদস্যের এই কমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার। কমিশনের অন্য দুই সদস্য হলেন— সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী।
ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের পর সর্বশেষ বিতর্কের সূত্রপাত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ভোটার ডেটাবেজের নির্ভুলতা, নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং ভোটার তালিকার নিরাপত্তা নিয়ে তার দুই সহকর্মী বারবার প্রশ্ন করেছেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেওয়া বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তের বিষয়ে কমিশনার সান্ধু ও যোশী আপত্তি জানিয়েছিলেন। কারণ, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও তাদের জানানো হয়নি। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি ঘটনায় কমিশনার সান্ধু ও যোশীকে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুই কমিশনার এমনকি ভারতের সরকারের শীর্ষ আমলা, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে চিঠি লিখে অভিযোগও করেছিলেন।
এ তথ্য প্রকাশের পর তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। সান্ধু ও যোশী অবশ্য প্রতিবেদনটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নির্বাচন কমিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ভিন্নমত’ থাকা ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার’ই অংশ।
এমন একসময়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো, যখন কমিশন দেশজুড়ে ভোটার ডেটাবেজের একটি বিতর্কিত পুনর্বিবেচনা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, এই ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনার (এসআইআর) উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকায় কোনো অযোগ্য ব্যক্তির নাম যেন না থাকে তা নিশ্চিত করা।
কমিশনের ভাষ্য, সর্বশেষ এমন পুনর্বিবেচনা প্রায় ২৫ বছর আগে করা হয়েছিল। ফলে যারা মারা গেছেন, দেশ ছেড়ে চলে গেছেন কিংবা নতুন ঠিকানায় চলে যাওয়ার পর একাধিক জায়গায় ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন, তাদের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। তবে শুরু থেকেই এই কার্যক্রম বিতর্কে জর্জরিত। বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে যে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দিতে তিনি ভোটার তালিকায় কারসাজি করছেন। বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন উভয়েই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে সর্বশেষ তথ্য প্রকাশের বিষয়টিকে আরও গুরুতর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার যেভাবে কমিশন পরিচালনা করছেন, তা নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশনের ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। শুরু থেকেই ভোটার তালিকার এই পুনর্বিবেচনা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এই কার্যক্রমে পুরো ভারতজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে লাখ লাখ ভোটার কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন, তাদের নাম ভোটার তালিকায় আর নেই। তারা জানান, এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য যে নতুন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত জটিল এবং এতে এমন সব নথি জমা দিতে হচ্ছে, যা অনেক ভোটারের কাছেই নেই।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি জানান, তিনি ‘শুরু থেকেই এসআইআরের সমালোচক’। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন, আমি সব সময় ভাবতাম কেন কমিশনার সান্ধু ও যোশী ‘চুপ করে ছিলেন। এখন আমি বুঝতে পারছি, তারা খুব নীরবে এবং নিঃশব্দে প্রতিবাদ করছিলেন, তারা নোট লিখছিলেন।এটি ভালো বিষয়, তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে।
সর্বশেষ এই তথ্যের প্রচার বিরোধী দলগুলো এবং সমালোচকদের জন্য জুগিয়েছে নতুন অস্ত্র। তারা বারবার দাবি করে আসছে, বিজেপির সুবিধার জন্য তাদের সমর্থকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে এসআইআর ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ভারতে নির্বাচন এখন আর অবাধ ও সুষ্ঠু নেই।
গত বুধবার ক্ষুব্ধ বিরোধী রাজনীতিকেরা আবারও ভারতের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন।
তারা বলেন, ‘তার আর পদে থাকার কোনো অধিকার নেই।’ এমনকি কেউ কেউ তার গ্রেফতারেরও দাবি জানান। এই অভিযোগের নেতৃত্ব দেন সংসদ সদস্য ও প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বারবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘বিরোধীদের ভোট চুরি’ করার অভিযোগ করে আসছেন। বুধবার তিনি নির্বাচন কমিশন এবং এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘ভোট চুরি ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ এবং আমাদের সংবিধানের ওপর সরাসরি আক্রমণ। বিজেপি, আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) এবং যারা এটি সংগঠিত করেছে সেই নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করেছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।’
তিনি ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওও শেয়ার করেন, যেখানে তিনি নির্বাচন কমিশন ও এর কর্মকর্তাদের বলেন, ‘আপনাদের সময় আসবে। আপনারা পার পাবেন না।’
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের আগে থাকা ভোটার তালিকা ব্যবহার করে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তিনি বিজেপির কাছে হেরে যান। এসআইআরের সময় রাজ্যটিতে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার সমর্থকদের দাবি, এর কারণে তারা কয়েক ডজন আসন হারিয়েছেন এবং নির্বাচনে জয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন এবং বিরোধী নেতাদের বক্তব্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন তাদের কাজের পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে আলোচনার সময় ভিন্নমত ও পর্যবেক্ষণ থাকা একটি স্বাভাবিক বিষয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অংশ। শুধু তিনজন কমিশনারই নন, নির্বাচন কমিশনের প্রত্যেক কর্মকর্তাই নির্বাচনি ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কমিশনের কাছে নিজেদের পরামর্শ দেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ১০ মাস সময়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কিছু নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ নোট ও পর্যবেক্ষণকে সামনে এনে, একই সময়ে অনুমোদন, সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা ও উদ্যোগের যে অনেক বৃহত্তর অংশ রয়েছে, তা উপেক্ষা করলে পুরো চিত্রের কেবল একটি অংশই সামনে আসে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কমিশন ‘প্রায় ৪০টি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং ভোটার তালিকার পুনর্বিবেচনা, যার মধ্যে এসআইআরও রয়েছে, সারাদেশে পরিচালনাসহ বহু নির্বাচনি সংস্কার কার্যকর করেছে। গত এক বছরে পূর্ণাঙ্গ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজেপিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটি বিরোধীদের সমালোচনাকে ‘কুৎসা রটনা’ বলে অভিহিত করেছে এবং বলেছে, ভিন্নমত থাকা ‘একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের লক্ষণ’।
দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্র এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক বিরোধী দল ভেঙে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু তারা নির্বাচনে জিততে পারছে না, তাই তারা ‘দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে’।
তবে ভোটার ডেটাবেজ নিয়ে এই বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোমধ্যে বলেছেন, যত দিন জ্ঞানেশ কুমার প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকবেন, তত দিন বিরোধী দলগুলো প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে। ভারতের প্রভাবশালী জেন জি নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি), যারা সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে, তারাও বলেছে যে তারা ‘ভারতের গণতন্ত্র ছিনতাইয়ের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এই আত্মপক্ষ সমর্থন অনেককে সন্তুষ্ট করার সম্ভাবনা কম। তাদের কেউ কেউ বলছেন, কমিশনের বিবৃতিতে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উত্থাপিত সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়নি এবং ‘কমিশনকে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হলে সিইসি কুমারকে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে’।
সূত্র: বিবিসি
এফএ




