বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

শ্রমিক সংকটে সার্বিয়া, চাহিদা বাড়ছে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় কর্মীর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

শ্রমিক সংকটে সার্বিয়া, চাহিদা বাড়ছে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় কর্মীর

ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় শ্রমিক সংকটের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। নির্মাণ, পরিবহন, পর্যটন ও উৎপাদন খাতে স্থানীয় কর্মীর ঘাটতি পূরণে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সার্বিয়ার শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক দফতরের ‘মাইগ্রেশন প্রোফাইল ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার ৬৭২ জন। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৪৭ জন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন রাশিয়ার নাগরিক, যা মোট বিদেশি কর্মীর ৩৫.৫ শতাংশ। এরপর চীনের নাগরিক ১৯.১ শতাংশ, ভারতের ১০.৭ শতাংশ, তুরস্কের ৯.১ শতাংশ এবং নেপালের ৪.২ শতাংশ।

সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্বিয়ায় অভিবাসনের সবচেয়ে প্রচলিত ধরন এখন শ্রম অভিবাসন। বিদেশি কর্মীদের বড় অংশ অস্থায়ী বসবাস ও কাজের একক অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে দেশটিতে অবস্থান করছেন।

২০২৫ সালের শেষে থাকা বিদেশি কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ চাকরির চুক্তি বা কর্মসংস্থান চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করছিলেন। প্রায় ১৮ শতাংশ ছিলেন স্বনির্ভর কর্মী।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে প্রয়োজন কর্মী

সার্বিয়ার শ্রম মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী দানিয়েল ইগ্রেচ বলেন, জনমিতিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে দেশটির অতিরিক্ত শ্রমশক্তির প্রয়োজন হচ্ছে।

২০২৫ সালের মে মাসে সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা জনমিতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমাদের বেকারত্বের হার রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে, ৮.৫ শতাংশে রয়েছে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির কারণে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি নিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে।”

তিনি বলেন, সার্বিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং বড় প্রকল্পের কারণে বিদেশি কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। ২০২৭ সালে সার্বিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এক্সপো আয়োজনের জন্যও অতিরিক্ত শ্রমশক্তির প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।

বিদেশি কর্মী নিয়োগে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

বিদেশি কর্মী নিয়োগকে আরও সংগঠিত করতে সার্বিয়া নতুন নিয়ম চালু করেছে। ইগ্রেচ বলেন, সরকার শ্রম অভিবাসনকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে কাজ করছে।

তিনি বলেন, শ্রম গতিশীলতা চুক্তিগুলো সংগঠিত কর্মসংস্থানের নীতি চালু করে। বিদেশি কর্মী নিয়োগ নির্ধারিত পদ্ধতির ভিত্তিতে হবে এবং রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে সবকিছু আইন ও চুক্তি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিদেশি কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত যাচাই ব্যবস্থা চালু করা হয়। শ্রম মন্ত্রণালয় নিয়মিত ও বিশেষ পরিদর্শনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান তিনি।

ইগ্রেচ আরও বলেন, অনেক বিদেশি কর্মী তাদের অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানায় সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি ও শ্রম অধিকার 

সার্বিয়ার বিভিন্ন শিল্প খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতিও বাড়ছে। দেশটির চীনা মালিকানাধীন লিংলং টায়ার কারখানায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে শ্রম অধিকার সংক্রান্ত অভিযোগ উঠেছে।

গত জানুয়ারিতে রেডিও ফ্রি ইউরোপ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেরেনিয়ানিন শহরের কাছে অবস্থিত ওই কারখানায় কিছু বাংলাদেশি কর্মী নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবেশ ও শ্রম অধিকার নিয়ে অভিযোগ করেছেন।

কিছু শ্রমিকের অভিযোগ, তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, ছবি তোলা বা ভিডিও করার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা হয়েছে।

শ্রম অধিকার সংগঠনগুলো কয়েক ডজন বাংলাদেশি কর্মীর সম্ভাব্য শ্রম শোষণ ও মানবপাচারের অভিযোগ সার্বিয়ার সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক বাংলাদেশি কর্মী সার্বিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রায় ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত ঋণ করেছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এতে বিদেশ যাওয়ার আগেই তারা আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ে যান।

সার্বিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের হয়নি।

শিল্প শহর ক্রাগুয়েভাচে বাড়ছে বিদেশি কর্মী

মধ্য সার্বিয়ার শিল্প শহর ক্রাগুয়েভাচে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে অঞ্চলটিতে বিদেশি কর্মীদের জন্য ১ হাজার ৭১৭টি বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম গ্লাস শুমাদিয়া জানিয়েছে, এসব কর্মীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন নেপাল, ভারত ও মরক্কোর নাগরিক। এছাড়া বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, চীন, ইরান, নাইজেরিয়া ও রাশিয়ার নাগরিকরাও রয়েছেন।

শহরটির প্রশাসন জানিয়েছে, স্থানীয় কিছু খাতে শ্রমিক সংকটের কারণে বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্রয়োজন হচ্ছে।

উজবেকিস্তানের সঙ্গে শ্রম অভিবাসন চুক্তি

বিদেশি কর্মী নিয়োগকে আরও সংগঠিত করতে সার্বিয়া ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের সঙ্গে শ্রম অভিবাসন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

সার্বিয়ার শ্রমমন্ত্রী মিলিৎসা জুরজেভিচ স্তামেনকোভস্কি বলেন, এটি দেশটির প্রথম এ ধরনের চুক্তি। তিনি জানান, চুক্তির আওতায় সার্বিয়ায় কাজ করতে আসা উজবেক নাগরিকরা স্থানীয় কর্মীদের মতো একই অধিকার পাবেন।

সার্বিয়ার এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, দেশটি শ্রম সংকট মোকাবিলায় এখন দ্বিপক্ষীয় শ্রম অভিবাসন চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি কর্মী আনার পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস 

এমএইচআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর