জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে সাধারণ পরিষদে শেষবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন আন্তোনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে দেওয়া এই ভাষণে তিনি বিশ্বনেতাদের চলমান যুদ্ধ বন্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং জাতিসংঘের সংস্কারের আহ্বান জানান।
পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস তার ভাষণে দ্রুত ক্রমবর্ধমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এআই মানবসভ্যতার উন্নয়নে বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতার চেয়ে প্রযুক্তির বিকাশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তাই এআই ব্যবহারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন’।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘যেসব দেশ এআই প্রযুক্তির বিকাশে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের উদ্ভূত নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য ভাগাভাগি করতে হবে এবং প্রযুক্তির পরীক্ষা ও মূল্যায়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে’। একই সঙ্গে তিনি সব দেশের জন্য অভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো দেশের স্বেচ্ছামূলক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বহুপক্ষীয় একটি এআই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা।
গুতেরেস জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থার কথাও তুলে ধরেন, কারণ নিউইয়র্কে প্রায় ১৩০ জন বিশ্বনেতা সমবেত হলেও এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত এবং জার্মানির নেতারা এই কূটনৈতিক সমাবেশ এড়িয়ে গেছেন।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে হুথিদের অগ্রগতির ফলে নৌ-পরিবহন রুট হুমকিতে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তিনি উত্তেজনা হ্রাস ও আলোচনার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন,‘ আসুন, এই ঐতিহাসিক হল থেকে আমরা সবাই একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাই, যুদ্ধ এখনই থামাতে হবে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌচলাচলের স্বাধীন অধিকার পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে হবে’।
এছাড়াও গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রে মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। পশ্চিম তীরে সংযুক্তিকরণমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করারও আহ্বান জানান তিনি।
রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, ‘জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি ন্যায়সংগত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে এগোনো প্রয়োজন’।
তার মতে, বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিয়ে গুতেরেস বলেন, দূষণকারীদের এর জন্য মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বৈষম্য বৃদ্ধিকে তিনি বিশ্বের বড় সংকটগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে গুতেরেস আরও বলেন, সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলো ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকাংশে অতীতের ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রতিফলিত করে। তাই পরিবর্তিত বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রয়োজন।
গত ১০ বছর ধরে পাশে থাকা বিশ্বনেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আগামী ১ জানুয়ারি যখন আমি আর মহাসচিব থাকব না, তখন এই বিষয়ে নিশ্চিত থাকুন; আমি যেখানেই থাকি না কেন, যাই করি না কেন; শান্তি যে সম্ভব, সেই বিশ্বাসের পক্ষে আমি আজীবন লড়ে যাব’।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের ৯ম মহাসচিব হিসেবে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তার সফল নেতৃত্বের কারণে ২০২২ সালে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নিয়োগ পান, যা আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স, এপি
এমএইচআর




