বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারের পানির চাহিদা ও স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের ক্ষমতাসীন জোটের শরিক জনতা দল–ইউনাইটেডের (জেডিইউ) নেতা ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় ঝা গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়ে বিহারের উদ্বেগের কথা কেন্দ্রীয় সরকারকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে জয়শঙ্কর তাকে চিঠি দিয়ে আশ্বস্ত করেন, চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বিহারের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সঞ্জয় ঝা-কে লেখা চিঠিতে জয়শঙ্কর বলেন, ‘গঙ্গা পানি চুক্তি সংক্রান্ত আপনার উদ্বেগ আমরা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারছি। আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় বিহার সরকারের একজন অনুমোদিত প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছিলেন।’
চুক্তি নবায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবে।’
১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফারাক্কা ব্যারাজে গঙ্গার পানির প্রবাহের ভিত্তিতে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের কাঠামো নির্ধারণ করে এই চুক্তি। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর চুক্তিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হবে।
চুক্তিটির নবায়ন নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে দুই দেশের কূটনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। তবে এই চুক্তিটি রাজ্যটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি করে সরকারকে চুক্তিটি নবায়ন না করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন সঞ্জয় ঝা-সহ বিহারের নেতারা।
২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিহারের পানিসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকা সঞ্জয় ঝা যুক্তি দিয়েছিলেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি বিহারের স্বার্থের ক্ষতি করেছে।
দ্য হিন্দু-কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটিকে ‘গুজরাল মতবাদ’ যুগের একটি অবশেষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যা ভারতের একটি উদার ভাবমূর্তি তুলে ধরলেও বিহারের স্বার্থ রক্ষা করেনি।
তিনি আরও বলেন, ‘বিহার কোনো সুবিধা চাইছে না। আমরা আমাদের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চুক্তি নবায়ন না করার কথা বলছি। যেন আমাদের ১৩ কোটি মানুষ আরও ৩০ বছরের জন্য খাবার, কৃষি ও শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাবে না পড়ে।’
সঞ্জয় দাবি করেন, ‘চুক্তিটি কার্যকর থাকার বিগত ৩০ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে বিহারের স্বার্থ নেতিবাচকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং ভারতের উচিত চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হতে দেওয়া।’
এছাড়াও বিহারের ক্ষমতাসীন সকারের নেতাদের অভিযোগ, ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত করার ফলে রাজ্যটি পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না। বিশেষ করে পানীয় জল, সেচ ও শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করার বিষয়টি তারা সামনে এনেছেন। একই সঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গায় পলি জমে নদীর গতিপথ ও বন্যা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও বিহারের রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সঞ্জয় ঝা ও বিহারের অনান্য নেতাদের আপত্তি ছাড়াও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বৈঠকের অভাবেও চুক্তিটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল, কিন্তু গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের জেরে সেই আলোচনা ভেস্তে যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহ কৃষি, নৌপরিবহন, মৎস্য ও পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে চুক্তির নবায়ন নিয়ে দিল্লির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বার্থের কারণে ঢাকার উদ্বেগও তৈরি করতে পারে।
সূত্র: দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এমএইচআর




