‘ইসলামে বিক্ষোভের অনুমতি নেই’– দাবি করে আফগানিস্তানে সব ধরনের বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে তালেবান সরকার। সম্প্রতি তালেবান বিচার মন্ত্রণালয়ের পাস করা নতুন ‘পুলিশ আইন’ (শুরতা আইন)-এর ৫০ নম্বর ধারায় দেশজুড়ে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘এই আইন ইসলামি শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিক্ষোভ ইসলামী ব্যবস্থার অংশ নয়; বরং গণতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এর প্রচলন রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, কোনো নাগরিকের অভিযোগ বা আপত্তি থাকলে রাস্তায় বিক্ষোভ না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা জানাতে পারবেন। বিক্ষোভের ফলে মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা রোধ করা জরুরি।
তার কথায়, ‘বিক্ষোভ এমন সমাজে দেখা যায়, যেখানে ভিন্ন ধরনের আইন কার্যকর থাকে। বিক্ষোভ নিষিদ্ধ হলে বিশৃঙ্খলা, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং সময়ের অপচয়ও কমবে।’
নতুন আইনে ক্ষমতা বাড়ল পুলিশের
গত ২২ আগস্ট তালেবান সুপ্রিম লিডার হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কর্তৃক অনুমোদিত নতুন এই ‘শুরতা আইন’ মোট ৫টি অধ্যায় এবং ৫৩টি ধারা রয়েছে। বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এই আইনে পুলিশের ক্ষমতা ব্যাপক বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং নাগরিকদের ওপর বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এই আইনে পুলিশকে নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সংশোধন করার জন্য বা তাদের স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে তালেবান পুলিশ চাইলে তাদের মৃত্যুর হুমকি দিতে পারবে।
অন্যদিকে সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে সর্বোচ্চ ৩ দিন আটকে রাখার যে নিয়ম ছিল, তা বাড়িয়ে এখন ১০ দিন পর্যন্ত করা হয়েছে।
আইনের ১৪ ধারায় তালেবান প্রশাসন যখন কোনো অপরাধীকে শারীরিক বা প্রকাশ্যে কোনো শাস্তি দেবে, তখন সেই শাস্তি কার্যকরের দৃশ্য ভিডিও বা ছবি রেকর্ড করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এছাড়াও আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া পুলিশ কোনো বন্দি বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে লাঠি, চাবুক দিয়ে পিটিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না। নারী ও শিশুদের গ্রেপ্তারের সময় ইসলামী নিয়ম মেনে চলার কথা বলা হয়েছে আইনে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ক্ষোভ
বিক্ষোভ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এটিকে তালেবানের ভিন্নমত দমনের আরও একটি পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও নতুন পুলিশ আইনকে আফগানিস্তানে মানবাধিকারের ওপর আরও বিস্তৃত আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত শহরে নারীদের অধিকার নিয়ে একটি বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত দুজন নিহত হন। নতুন আইন কার্যকর হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকাশ্য প্রতিবাদের সুযোগ আরও সংকুচিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই আফগানিস্তানে বিক্ষোভের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অধিকার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন দাবিতে হওয়া বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র: ডন, আফগানিস্তান ইন্টারন্যাশনাল
এমএইচআর




