জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়—ক্রমেই তা বাস্তব হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো শহরগুলোর বহু এলাকা অদূর ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঘরবাড়ি হারানোর তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সোমবার জাতিসংঘের প্রকাশিত ‘চ্যালেঞ্জেস রিলেটেড টু সি লেভেল রাইজ অ্যান্ড ওয়েজ অ্যান্ড অ্যাপ্রোচেস টু অ্যাড্রেস ইট’— শিরোনামে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চলকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে কলকাতা ও মুম্বাইয়ের পাশাপাশি ঢাকার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, এই অঞ্চলে সমুদ্রের পানি স্থায়ীভাবে স্থলভাগে ঢুকে পড়লে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারানোর তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে এই সংখ্যার মধ্যে বাংলাদেশের কত মানুষ, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ৬ মিলিমিটারে পৌঁছেছিল—যা রেকর্ড সর্বোচ্চ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ ও বরফের স্তর গলে যাওয়া এবং উষ্ণ পানির প্রসারণকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা নিচু বদ্বীপভূমি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কৃষি, মৎস্য, সুপেয় পানি ও মানুষের বসতিতে।
জাতিসংঘের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব শুধু উপকূলীয় জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, নদীভাঙন ও মাটির লবণাক্ততার কারণে ইতোমধ্যে মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে; ফলে ভবিষ্যতে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যাগত ও অবকাঠামোগত চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হতে পারে এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ঘন ঘন বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস মানুষের ঘরবাড়ি, সড়ক, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি করতে পারে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে শুধু উপকূলীয় সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি ‘সিস্টেমিক থ্রেট’ বা সামগ্রিক হুমকি। এর প্রভাব স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, মানবাধিকার, সংস্কৃতি এবং মানুষের পূর্বপুরুষের জমি ও পরিচয়ের ওপরও পড়তে পারে। ফলে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
সূত্র: এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস
এমএইচআর




