সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে গত দেড় বছর ধরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের রায় ঘিরে সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যেই ভারতকে সরাসরি সতর্ক করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘পানিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না’।
মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের দেওয়া বক্তব্যে শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘পানি পুরো অঞ্চলের জীবনরেখা। এটি কোটি কোটি মানুষের জন্য অপরিহার্য, যা আমাদের ভূমিকে পুষ্ট করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের নিশ্চয়তা দেয়।’
তিনি বলেন, ‘অভিন্ন নদীর পানি কোনোভাবেই রাজনৈতিক চাপ বা সংঘাতের হাতিয়ার করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আমাদের যৌথ জলসীমা নিয়ন্ত্রণকারী চুক্তিগুলো হলো পবিত্র ও বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার। এগুলো রাজনৈতিক সুবিধার বিষয় নয় যে, ইচ্ছেমতো উপেক্ষা করা যাবে।’
সরাসরি ভারতের নাম উল্লেখ না করে শাহবাজ শরিফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘পানি নিয়ে যেকোনো একতরফা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাকিস্তান তার স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেবে’।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এলো, যখন ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
গতকাল সোমবার (৩১ আগস্ট) হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত- ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব অরবিট্রেশন’ জানায়, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং ভারত একতরফাভাবে এটি স্থগিত করতে পারে না। আদালত ভারতের কিছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলার কথা বলেছে।
তবে আদালতের এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। নয়াদিল্লির দাবি, সংশ্লিষ্ট সালিসি আদালতের এই বিষয়ে কোনো এখতিয়ার নেই এবং ভারত ওই কার্যক্রমে অংশও নেয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব অরবিট্রেশন’ আদালতকে অবৈধভাবে গঠিত বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, রায় ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত কিংবা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
অন্যদিকে পাকিস্তান আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। ইসলামাবাদের অবস্থান, সিন্ধু পানি চুক্তি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বাধ্যতামূলক চুক্তি। ফলে ভারত একতরফাভাবে চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত করতে পারে না।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক সিন্ধু পানি চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে এবং এটি উভয় দেশের জন্যই আইনিভাবে বাধ্যবাধকতামূলক। কোনো আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিকে একপক্ষ ইচ্ছামতো বাতিল বা স্থগিত করতে পারে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভারতের উচিত এই চুক্তির অধীনে নিজেদের সমস্ত আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।
এদিকে পানি নিয়ে পাকিস্তান সরকারের এই ধরনের বক্তব্য অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে ভারতকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
চলতি মাসেই ইসলামাবাদের এক অনুষ্ঠানে শাহবাজ শরিফ হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানের পানির প্রতিটি ফোঁটা আমাদের জন্য রেড লাইন। ভারত যদি এই সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তবে তাকে সরাসরি ও উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে’।
ভারতের পানি বন্ধের হুমকির জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘শত্রু দেশ পাকিস্তান থেকে এক ফোঁটা পানিও কেড়ে নিতে পারবে না। ভারত যদি পাকিস্তানের পানি আটকে দেওয়ার দুঃসাহস দেখায়, তবে পাকিস্তান এমন শিক্ষা দেবে যা তারা কোনোদিন ভুলবে না।’
অন্যদিকে সিন্ধু নদে ভারত বাঁধ নির্মাণ করলে তা মিসাইল মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ডমার্শাল অসীম মুনির।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি পানি এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ সংকুচিত হলে সিন্ধু নদীর পানি নিয়ে বিরোধ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শাহবাজ শরিফের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি শুধু দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বার্তা নয়; বরং পানি ইস্যুকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার পাকিস্তানি প্রচেষ্টারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সিন্ধু এবং তার উপনদীগুলোর পানি বণ্টনের জন্য বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী— সিন্ধু অববাহিকার রাভি (ইরাবতী), বিয়াস (বিপাশা) ও সুতলেজ (শতদ্রু) নদীর পানি ভারতের জন্য বরাদ্দ। আর সিন্ধু, ঝেলাম ও চেনাব নদীর ৮০ শতাংশ পানি পায় পাকিস্তান।
এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও টিকে ছিল। তবে চলতি বছরের গত ২২ এপ্রিল ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার পরেই পাকিস্তানকে দায়ী করে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে মোদি সরকার।
সূত্র: ডন, রয়টার্স
এমএইচআর





