মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের নতুন বোয়িং বিমান ক্রয়ের চুক্তি হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া-বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের এমন আকস্মিক দাবির পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সার্জিও গোর এই দাবি করেন।
ওই পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, ‘এই সপ্তাহেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অঙ্গীকার নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি দারুণ চুক্তি করেছেন’।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গত ৩০ এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। তখন বোয়িং থেকে ১৪ টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়েছিল। এখন সেই সংখ্যা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে সার্জিও গরের এক্স-এ দেওয়া পোস্ট।
যদিও বিমান বাংলাদেশের মুখপাত্র মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, উড়োজাহাজ নিয়ে বিমানের সঙ্গে বোয়িং এর প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে, যেখানে গোপন কিছু নেই।
ওই চুক্তির বাইরে আরও বোয়িং কেনা হচ্ছে কি-না কিংবা সার্জিও গর তার পোস্টে যা দাবি করেছেন তা নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে যোগ করার মতো আর কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই’।
এছাড়াও সার্জিও গরের দাবিকৃত চুক্তিটি কখন-কোথায় হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়নি ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস।
পোস্টে সার্জিও গর যা বলেছেন
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর ঢাকা সফরে এসে গত ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ‘এই সফর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপকতা ও গভীরতাকে তুলে ধরেছে।’
সামাজিক মাধ্যম এক্স -এ দেওয়া পোস্টে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা সার্জিও গর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার ইতিহাসের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট। তিনি লাখ লাখ উচ্চ-বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে, ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করছেন’।
গর আরও লিখেছেন, ‘এই সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অসাধারণ চুক্তি করেছেন। এর আওতায় বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আরও বেশি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের প্রাথমিক ক্রয়াদেশের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে’।
‘আমাদের প্রেসিডেন্ট আমেরিকা এবং আমাদের অংশীদারদের আবারও মহান করার-এর পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন’, —এমন মন্তব্য দিয়ে তিনি তার পোস্ট শেষ করেছেন।
কিন্তু এই পোস্টে তিনি নতুন করে আরও বোয়িং বাংলাদেশ কিনতে যাচ্ছে বলে দাবি করলেও এর কোনো বিস্তারিত দেননি। কবে এই চুক্তি হয়েছে সেটিও তিনি প্রকাশ করেননি।
বোয়িং, এয়ারবাস ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গত ত্রিশে এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪ টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিকে স্বাক্ষর করেছে।
বিমান বাংলাদেশের এক বিজ্ঞপ্তিতে তখন জানানো হয়েছে, যে ১৪ টি উড়োযান কেনা হবে তার মধ্যে ১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার মডেলের। আর চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ।
ওই সময় জানানো হয়েছিল, ১৪টি উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তখনকার বিমান পরিবহনমন্ত্রী আফরোজা খানম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এই নতুন উড়োজাহাজগুলো বিমানের বহরের আধুনিকায়ন ঘটাবে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বোয়িংয়ের বিমান কেনার আলোচনা সামনে আসে।
এর মধ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস বাংলাদেশকে আরও ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। তাদের প্রস্তাবে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ বিক্রির কথা বলা হয়েছে।
এ নিয়ে আলোচনার জন্য জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফর করে তখনকার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে গেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রদূতেরা।
পরে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ‘বৈঠকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এয়ারবাস উড়োজাহাজ যুক্ত করার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় মন্ত্রী দেশীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে টেকসই মিশ্র বহর গঠনের লক্ষ্যে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সরকারের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন’।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এয়ারবাসের সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আলোচনা হয়েছিল।
চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লি তখনকার বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের বিমান বহরের সঙ্গে এয়ারবাসের অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
তখন ফরাসি দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে রাষ্ট্রদূতকে উদ্ধৃত করে বলেছিল, ‘এয়ারবাসের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরের সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বিমান চলাচল খাতকেও শক্তিশালী করবে’।
বিমানের বহরে যা আছে, পরিকল্পনা কী
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এছাড়া ২০২৭ সালের মধ্যে আরও দশটি উড়োজাহাজ ভাড়া বা লিজ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বিমান।
বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত গত ২৩শে অগাস্ট এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই এ নিয়ে তিনি চুক্তি স্বাক্ষর করতে চান।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আরো কিছু বিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। তবে চুক্তি হওয়া না হওয়ার বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি।
এর আগে চলতি বছরের জুনে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তখনকার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খান রিতা জানিয়েছিলেন যে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০৩৫ সালের মধ্যে বহরের উড়োজাহাজ সংখ্যা ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এই লক্ষ্যেই ইতোমধ্যে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘ফ্লিট এক্সপ্যানশন প্ল্যান ২০২৬-২০৩৫’ অনুযায়ী ২০৩৫ সালে সংস্থাটির বহরে মোট ৪৭টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন হবে।
এ লক্ষ্য অর্জনে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার জন্য বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। পাশাপাশি বিমানের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মিশ্র বহর (মিক্সড ফ্লিট) গঠনের অংশ হিসেবে আরও উড়োজাহাজ সংযোজনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন মন্ত্রী।
গত ১৬ জুলাই বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছিলেন, ‘আমাদের বোয়িংও দরকার, এয়ারবাসও দরকার। আমরা দুটোই ক্রয় করব’।-বিবিসি বাংলা
এমএইচআর




