বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালে লাশের সংখ্যা বাড়ছেই। পাঁচ দিন আগে সংঘটিত এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৬৯১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখনো নিখোঁজ আছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে উদ্ধার অভিযান।
চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা শনিবার রাতে জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৭৫ হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪৯৮ জন।
প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে আকাশপথে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটে শনিবার দুপুরের আগে আবারো হেলিকপ্টার চলাচল শুরু হয়। এর আগে খারাপ আবহাওয়ার কারণে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
কয়েকটি হেলিকপ্টারে কাপড়, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, বিস্কুট ও চালসহ ত্রাণসামগ্রী বোঝাই করে দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়। অন্য কয়েকটি হেলিকপ্টার বন্যাকবলিত এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে।
নেপালি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো দুর্যোগকবলিত এলাকায় ঘণ্টায় মোট ১৫টি যাতায়াত করতে পারে। দিনে এভাবে প্রায় ৫০০টি ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব। প্রতিটি ফ্লাইটে কয়েকজন করে মানুষকে উদ্ধার করে আনা হচ্ছে। তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে স্ট্রেচারে করে আনা হচ্ছে।
নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে কয়েক শ বিদেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর শনিবার সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছে, নেপালকে ৩৬ লাখ ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে তিন মাসের জরুরি খাদ্য সহায়তাও রয়েছে, যা সর্বোচ্চ ১০ হাজার পরিবারকে সহায়তা করবে।
সুড়ঙ্গে আটকে থাকা কয়েক ডজন মানুষের সন্ধানে অভিযান
নেপাল সরকার জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলোতে এখনো শতাধিক শ্রমিক জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন। তাদের উদ্ধারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
আটকে পড়া শতাধিক শ্রমিক একই জায়গায় রয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। তবে নেপালের জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, একাধিক সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান চলছে।
উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টারের ঝুড়ি ও দড়ি ব্যবহার করে কয়েকজনের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর কাদা এবং হেলিকপ্টার অবতরণের উপযুক্ত জায়গার স্বল্পতার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত।
শনিবার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে জমে থাকা কাদা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশের পথ তৈরি করতে সক্ষম হন উদ্ধারকারীরা। এরপর সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস প্রবেশ করানো শুরু করা হয়। সেখানে মাটি খননের কাজও চলছে বলে জানিয়েছেন নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সুড়ঙ্গের ভেতরে ক্যামেরা পাঠানোর কাজও শুরু হয়েছে।
আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে ভারত ও চীনের বিশেষায়িত সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দলও যোগ দিয়েছে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টসহ হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গে উদ্ধারকাজে অভিজ্ঞ নেপালের বিশেষজ্ঞ পর্বতারোহী উদ্ধারকারী দলও নিখোঁজদের সন্ধানে যোগ দিয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতর প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, উদ্ধারকর্মীরা কোমরসমান কাদার মধ্যে দিয়ে হেঁটে এবং বন্যায় ভেসে আসা বিশাল পাথরের স্তূপ পেরিয়ে কাজ করছেন।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিসির খানাল বলেছেন, এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করাই ‘এই মুহূর্তে আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার’। তিনি জানান, সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান, জীবিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার প্রযুক্তি, দ্রুত ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত হিমায়িত ব্যবস্থা-এসব বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে বিশেষজ্ঞ সহায়তা চেয়েছে নেপাল সরকার।
এমআর




