শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কারাগারেই মারা গেলেন ‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচ 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

শেয়ার করুন:

কারাগারেই মারা গেলেন ‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচ 

বসনিয়ায় মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানো রাতকো ম্লাদিচ কারাগারে মারা গেছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। 

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। কয়েকবার স্ট্রোক করার পর হেগ-এর একটি কারাগার হাসপাতালে গত ২৭ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। খবর সিএনএনের।

১৯৯২-৯৫ সালের বসনিয়া যুদ্ধের সময় স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় ভূমিকার জন্য 'বসনিয়ার কসাই' হিসেবে পরিচিত রাৎকো ম্লাদিচ যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। 

২০১৭ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিওয়াই) ম্লাদিচকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়ার সংগঠিত গণহত্যায় ভূমিকার জন্য ম্লাদিচকে দায়ী করা হয়, যার মধ্যে ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসায় ৮,০০০ মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যার ঘটনাও রয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বেশ কয়েকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন রাতকো ম্লাদিচ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাতের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার ঘটনায় গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দ্য হেগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন তিনি।

শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে ম্লাদিচকে মুক্তি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল সার্বিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা ও তার পরিবার। তবে দ্য হেগের ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন নাকচ করে দেন।

সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতনের পর যখন রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তখন নৃশংসতার জন্য কুখ্যাত তিন নেতার অন্যতম ছিলেন ম্লাদিচ। 

তিনি সামরিক দিকটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচ ও সাবেক বসনিয়ান সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচ।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা ওই যুদ্ধে প্রায় ১ লাখ মানুষ নিহত এবং ২২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

যুদ্ধের সবচেয়ে কুখ্যাত নৃশংসতা ঘটে স্রেব্রেনিৎসায়। সেখানে জাতিসংঘের সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত একটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া বসনিয়ার মুসলিম পুরুষ ও কিশোরদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার জনকে ম্লাদিচের নেতৃত্বাধীন সার্ব বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে।

সেই সময়ের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নারী ও শিশুদের বাসে করে সরিয়ে নেওয়ার আগে ম্লাদিচ শিশুদের হাতে মিষ্টি তুলে দিচ্ছেন। এরপর পুরুষদের একটি বনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।

হত্যার পর মরদেহগুলো গণকবরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে প্রমাণ গোপন করার চেষ্টা হিসেবে এসব গণকবরের অনেকগুলো থেকে মরদেহ তুলে অন্যত্র পুনরায় দাফন করা হয়।

স্রেব্রেনিৎসা থেকে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া অল্পসংখ্যক মানুষ বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর হাতে হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের ভয়াবহ বর্ণনা দেন।

১৯৯৫ সালের নভেম্বরে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিওয়াই) ম্লাদিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। তাকে সামরিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও আরও ১৬ বছর গ্রেফতার এড়িয়ে ছিলেন তিনি।

শুরুর দিকে বিলাসী জীবন কাটিয়েছেন ম্লাদিচ। সার্বিয়ার সামরিক বাহিনী তাকে নানা সুবিধা দিয়ে রেখেছিল। দেশটির কিছু মানুষ আজও তাকে নায়ক হিসেবে দেখে।

তবে ২০০০ সালে মিলোশেভিচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ম্লাদিচের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের মে মাসে তাকে গ্রেফতার করে দ্য হেগে নেওয়া হয়।

বিচার ও পরবর্তী আপিলের পুরো প্রক্রিয়ায় ম্লাদিচ গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে গেছেন।

বিচারকদের উদ্দেশে একাধিকবার ক্ষুব্ধ বক্তব্য দেন রাতকো ম্লাদিচ। আদালতকে ‘পশ্চিমা শক্তির সন্তান’ বলে আখ্যা দেন এবং নিজেকে ‘ন্যাটো জোটের লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে তুলে ধরেন।

২০১৭ সালে রাতকো ম্লাদিচকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২১ সালে আপিলেও সেই সাজা বহাল থাকে।

ম্লাদিচকে মুসলিম ও বসনীয়দের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে বিতাড়িত করে তথাকথিত ‘বৃহত্তর সার্বিয়া’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাপক জাতিগত নিধন অভিযান পরিচালনার জন্যও দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

তৎকালীন ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, ম্লাদিচের সময়ে সংঘটিত অপরাধগুলো ‘মানবজাতির জানা সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলোর মধ্যে অন্যতম’। সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকারপ্রধান জেইদ রা’দ আল-হুসেইন তাকে ‘অশুভর প্রতিমূর্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

জীবনের শেষ দিকে ম্লাদিচের আইনজীবীরা মানবিক কারণে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন।

রাতকো ম্লাদিচের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘তিনি মারাত্মক ও নিরাময়–অযোগ্য শারীরিক অবস্থার মধ্যে আছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারাগারে আটকে রাখার কোনো বৈধ উদ্দেশ্য নেই। এটি অমানবিক আচরণ ও শাস্তির পর্যায়ে পড়ে।’

ম্লাদিচের বয়স নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল। তিনি দাবি করতেন, তার জন্ম ১৯৪৩ সালের মার্চে। তবে ট্রাইব্যুনালের নথিতে তার জন্মসন হিসেবে ১৯৪২ সাল উল্লেখ করা হয়েছে।

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর