বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

গাজা পরিস্থিতির অবনতি, ইসরায়েলকে দুষলেন বোর্ড অব পিসের দূত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

গাজা পরিস্থিতির অবনতি, ইসরায়েলকে দুষলেন বোর্ড অব পিসের দূত
নিকোলাই ম্লাদেনভ। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত বোর্ড অব পিসের গাজা বিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেছেন, হামাস যে নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি। গাজা পুনর্গঠন ও যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বোর্ড অব পিসের উদ্যোগ এখন এমন এক অচলাবস্থায় আটকে আছে, যেখানে একদিকে হামাসকে অস্ত্র ত্যাগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা, সেনা প্রত্যাহারে অনাগ্রহ এবং মানবিক সহায়তা ও আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বোর্ড অব পিসের গাজা বিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ সংস্থাটির গাজা পুনর্গঠন ও শান্তি প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। সেখানে তিনি জানান, হামাস নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও ইসরায়েল সেটি প্রত্যাখ্যান করার পর থেকে পরিকল্পনাটি এগোয়নি।

ম্লাদেনভ বিশেষভাবে গাজায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের জন্য আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধের সমালোচনা করেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অত্যন্ত খারাপ পরিস্থিতিতে বসবাস করা মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার নীতিরও সমালোচনা করেন তিনি। তার বক্তব্য, এসব হামলা হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।

তবে হামাসকেও ছাড় দেননি ম্লাদেনভ। নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনার আওতায় হামাস ও ইসরায়েল উভয় পক্ষের সব ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার কথা ছিল। তিনি বলেন, হামাস এখনো তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি।

চলতি মাসের শুরুতে মধ্যস্থতাকারী একটি আরব দেশের কূটনীতিক টাইমস অব ইসরায়েলকে জানিয়েছিলেন, বোর্ড অব পিস হামাসের ওপর গাজায় সশস্ত্র ও ইউনিফর্ম পরা সদস্যদের রাস্তায় মোতায়েন বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার পর গাজায় হামাসের এই ধরনের শক্তি প্রদর্শন আরও বেড়েছে।

গত ৩০ জুলাই হামাস যে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল, তাতে ইসরায়েলের ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু যুক্তি দেন, প্রস্তাবটি বাস্তবে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য করবে না। তাই তিনি ঘোষণা করেন, ইসরায়েল ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করবে না।

ম্লাদেনভ নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, ইসরায়েলকে সরাসরি ওই নিরস্ত্রীকরণ রোডম্যাপ মেনে নিতে বলা হচ্ছে না। বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার অধীনে ইসরায়েল যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, সেগুলো পুনরায় নিশ্চিত করতে বলা হচ্ছে।

নেতানিয়াহু গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের ওই কাঠামো গ্রহণ করেছিলেন। এর পরের মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ম্লাদেনভ বলেন, ইসরায়েল ওই কাঠামোর প্রতি আবারও সমর্থন জানিয়েছে। তবে বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। তাঁর বক্তব্য কার্যত ইঙ্গিত করে যে ইসরায়েল ওই প্রতিশ্রুতিগুলোর সবগুলো পালন করেনি। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং গাজায় মানবিক সহায়তা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে।

হামাস নিরস্ত্রীকরণে সম্মতি দেওয়ার পর দুই পক্ষের জন্য ১৪ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের একটি সময়সূচি তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু সেই দুই সপ্তাহের সময়সীমা এখনো শুরু হয়নি। অক্টোবর ২৭-এর নেসেট নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, নেতানিয়াহুর কাছ থেকে এ বিষয়ে অগ্রগতি বা নমনীয়তার সম্ভাবনাও কম বলে মনে করা হচ্ছে।

ম্লাদেনভ বলেন, গত বছরের তুলনায় গাজার মানবিক পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। গত বছর প্রথমবারের মতো একটি বৈশ্বিক খাদ্যসংকট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ঘনবসতিপূর্ণ উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল। গত বছর ইসরায়েল দুই মাসেরও বেশি সময় গাজায় ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ রেখেছিল। তবে ইসরায়েল জোরালোভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ত্রাণ চুরি করার জন্য হামাসকে দায়ী করে।

সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ব্যাপক ও ভয়াবহ ক্ষুধা ছড়িয়ে পড়লেও দুর্ভিক্ষ ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট সীমা শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি।

ম্লাদেনভ বলেন, বর্তমানে গাজার প্রয়োজনের ধরনও বদলেছে। খাদ্যের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানি ও জ্বালানি। জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ইসরায়েল এসব সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করছে। তবে আশ্রয়ের সংকট এখনো অত্যন্ত তীব্র। গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের অধিকাংশই এখনো তাঁবুতে বসবাস করছে।

এ পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ইসরায়েলকে দায়ী করেন ম্লাদেনভ। যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি সংস্থার জ্যেষ্ঠ দূতের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি সমালোচনা বিরল। তিনি বলেন, শীতকাল সামনে এবং গাজায় উন্নতমানের আশ্রয়স্থল প্রবেশের বিষয়ে ইসরায়েলের বর্তমান নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের মর্যাদা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য গাজায় আরও ভালো আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ম্লাদেনভ গাজায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না করার নীতিরও সমালোচনা করেন। ইসরায়েল এসব প্রায় প্রতিদিনের হামলাকে হামাসের সদস্যদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযান বলে দাবি করে। কিন্তু এসব হামলায় ফিলিস্তিনি বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক নিহত হচ্ছেন।

ইসরায়েলের এই নীতির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নিরাপত্তা পরিষদকে ম্লাদেনভ প্রশ্ন করেন, গাজায় একটি অস্ত্রভাণ্ডারে আরেকটি হামলা চালালে কি হামাসকে পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহ করা বা গাজার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা থেকে ঠেকানো যাবে? তাঁর উত্তর, যাবে না। তাঁর মতে, এ ধরনের হামলা শুধু গাজার নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে। একই সঙ্গে যে বেসামরিক রূপান্তরের মাধ্যমে ভবিষ্যতে হামাসের পুনরায় সামরিক শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ বন্ধ করার কথা, এসব হামলা সেই প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

ইসরায়েলের সমালোচনার পাশাপাশি হামাসের প্রতিও কঠোর বার্তা দিয়েছেন ম্লাদেনভ। তিনি বলেন, হামাস সব সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর মতে, হামাসের সদস্যদের হাতে প্রতিটি অস্ত্র, নতুন করে কোনো সুড়ঙ্গে কাজ করা এবং কোনো ত্রাণ বা পরিবহন কাফেলা আটকে দেওয়ার প্রতিটি ঘটনা শান্তি প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এগুলো তাদের যুক্তি শক্তিশালী করে, যারা আবার যুদ্ধ শুরু করতে চায়।

ম্লাদেনভ শেষ পর্যন্ত গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, গাজার আরেকটি বিপর্যয় মোকাবিলার মতো শক্তি নেই। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এবং গাজা আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ডুবে গেলে ফিরে আসার জন্য আর কোনো রোডম্যাপ থাকবে না। তাঁর ভাষায়, সেটি হবে ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন বা সবার জন্য ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো একটি পরিস্থিতি।’

এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর