বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

বিভিন্ন দেশে নবীজির জন্মদিন যেভাবে পালিত হয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

শেয়ার করুন:

বিভিন্ন দেশে নবীজির জন্মদিন যেভাবে পালিত হয়

নবীজি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জন্মদিনকে ঘিরে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছরই দেখা যায় নানা আয়োজন। কোথাও বর্ণিল শোভাযাত্রা, কোথাও আলোকসজ্জা, আবার কোথাও সীরাত আলোচনা, জিকির ও দরুদ পাঠের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়। এসব আয়োজনের ধরন দেশভেদে বদলে গেছে স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রভাবে।

ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্মোৎসব ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিকভাবে একে প্রধানত ‘মাওলিদ আন-নাবী’ বা সংক্ষেপে ‘মাওলিদ’ নামেই সম্বোধন করা হয়।  

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাওলিদ উপলক্ষে পালিত কিছু আয়োজন তুলে ধরা হলো—

মরক্কো: মোমবাতির শৈল্পিক শোভাযাত্রা

মরক্কোর সালে শহরে মাওলিদ উপলক্ষে অন্যতম দৃষ্টিনন্দন আয়োজন হলো ঐতিহ্যবাহী মোমবাতির শোভাযাত্রা। কয়েক শত বছরের পুরোনো এই আয়োজনে বিশেষ নকশায় তৈরি বড় আকৃতির রঙিন মোমবাতি ও মোমের কাঠামো নিয়ে শহরের রাস্তায় শোভাযাত্রা বের হয়।

মসজিদের মিনারের আদলে তৈরি এসব কাঠামো নানা নকশায় সাজানো হয়। পরে সেগুলো নিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই আয়োজন সালেকে মাওলিদ উপলক্ষের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত করেছে।

Mawlid_al-Nabi
মরক্কো

মিসর: চিনির পুতুল ও উৎসবের বাজার

মিসরে মাওলিদকে ঘিরে রয়েছে আলাদা এক লোকজ সংস্কৃতি। কায়রোসহ বিভিন্ন শহরের বাজারে এ সময় বিশেষ মিষ্টির সমারোহ দেখা যায়। এর মধ্যে পরিচিত ‘আরুসা আল-মাওলিদ’ বা মাওলিদের পুতুল।

চিনি দিয়ে তৈরি ঘোড়া ও পুতুলের আকৃতির এসব মিষ্টি মূলত শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ধরনের বাদাম, মিষ্টি ও অন্যান্য খাবারও এ সময় বাজারে পাওয়া যায়। পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে এসব খাবার ভাগাভাগির রীতিও রয়েছে।

Mawlid_al-Nabi
মিসর

তুরস্ক: ‘মেভলিদ কান্দিলি’ 

তুরস্কে মাওলিদ উপলক্ষটি পরিচিত ‘মেভলিদ কান্দিলি’ নামে। এ উপলক্ষে মসজিদগুলোতে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, মেভলিদ পাঠ এবং নবীজি (স.)-এর জীবন ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

কান্দিল রাতগুলোর সঙ্গে মসজিদে আলোকসজ্জার ঐতিহ্যও জড়িয়ে আছে। এ সময় বিভিন্ন মসজিদের মিনার আলোকিত করা হয়। কোথাও কোথাও মানুষের মধ্যে খাবার ও মিষ্টি বিতরণের রীতিও দেখা যায়।

Mawlid_al-Nabi
তুরস্ক

তিউনিসিয়া: ‘আসিদাত জগুগু’র মিষ্টি স্বাদ

তিউনিসিয়ায় মাওলিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশেষ একটি খাবারের ঐতিহ্য—‘আসিদাত জগুগু’। জগুগু বীজ দিয়ে তৈরি এই মিষ্টান্নে দুধ, চিনি ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয় এবং ওপর থেকে বাদাম দিয়ে সাজানো হয়।

মাওলিদ উপলক্ষে বহু পরিবারে এটি তৈরি করা হয়। পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে খাবার ভাগ করে নেওয়ার রীতিও রয়েছে। ফলে মাওলিদের আয়োজনের সঙ্গে সেখানে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।

Mawlid_al-Nabi
আসিদাত জগুগু

 

ইন্দোনেশিয়া: ‘গ্রেবেগ মুলুদ’ ও খাবারের পাহাড়

ইন্দোনেশিয়ায় মাওলিদ উদযাপনের ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন। জাভা দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ‘গ্রেবেগ মুলুদ’ নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ‘গুনুঙ্গান’।

ফল, শস্য ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দিয়ে তৈরি বিশাল স্তূপ বা গুনুঙ্গান নিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। পরে এসব সামগ্রী মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। আচেহ প্রদেশেও মাওলিদ উপলক্ষে বড় পরিসরে সামষ্টিক খাবার আয়োজন ও ভাগাভাগির ঐতিহ্য রয়েছে।

Mawlid_al-Nabi
ইন্দোনেশিয়া

পাকিস্তান: আলোকসজ্জা ও বড় সমাবেশ

পাকিস্তানে রবিউল আউয়াল মাসজুড়ে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’কে ঘিরে নানা আয়োজন দেখা যায়। করাচি, লাহোরসহ বিভিন্ন শহরে মসজিদ, সড়ক, বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। 

Mawlid_al-Nabi
Caption

এছাড়া কোথাও কোথাও জুলুস (শোভাযাত্রা), কোথাও মিলাদ, সীরাত সম্মেলন ও ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সেনেগাল: ‘গামু’ ও রাতভর ধর্মীয় আয়োজন

পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগালে মাওলিদ পরিচিত ‘গামু’ নামে। তিভাওয়ানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কেন্দ্রে এ উপলক্ষে বড় সমাবেশ হয়। ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং নবীজি (স.)-এর জীবন ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা চলে রাতভর।

গামু দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্ষিক আয়োজন। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।

সোমালিয়া: মিছিল ও প্রশংসাগীতি

সোমালিয়ায় মাওলিদ উপলক্ষে রাজধানী মোগাদিশুসহ বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত আয়োজন দেখা যায়। কোথাও মিছিল বের হয়, কোথাও নবীজি (স.)-এর প্রশংসায় কাসিদা ও ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

মাওলিদকে ঘিরে এসব আয়োজনের সঙ্গে মানুষের মধ্যে খাবার ভাগ করে দেওয়া এবং সামাজিকভাবে একত্র হওয়ার মতো কর্মকাণ্ডও যুক্ত থাকে।

Mawlid_al-Nabi
সোমালিয়া

ইরাক: ঐতিহাসিক কেন্দ্র ঘিরে আয়োজন

ইরাকের বাগদাদে মাওলিদ উপলক্ষে শেখ আবদুল কাদির আল-জিলানি (রহ.)-এর মাজারকে ঘিরে ধর্মীয় আয়োজন দেখা যায়। মানুষ সেখানে সমবেত হয়ে দোয়া, জিকির ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

ইরাকের সঙ্গে মাওলিদ উদযাপনের ঐতিহাসিক সম্পর্কও রয়েছে। বর্তমান ইরাকের আরবিল শহরে মধ্যযুগে বড় আকারে মাওলিদ আয়োজনের ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়।

Mawlid_al-Nabi
ইরাক

 

কাশ্মীর: হজরতবাল ঘিরে বড় সমাবেশ

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে মাওলিদ উপলক্ষে বড় সমাবেশ হয় হজরতবাল শরিফকে ঘিরে। সেখানে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি নামাজ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নেন।

হজরতবালে সংরক্ষিত ‘মোয়ে মুকাদ্দাস’ নামে পরিচিত পবিত্র স্মারককে ঘিরেও মানুষের বিশেষ আবেগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মাওলিদ উপলক্ষে এটি প্রদর্শন করা হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে সমবেত হন।

Mawlid_al-Nabi
হজরতবাল শরিফ

 

ইয়েমেন: সবুজের সমারোহ

ইয়েমেনে মাওলিদ উপলক্ষে সবুজ রঙের ব্যবহার বিশেষভাবে চোখে পড়ে। রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন শহরে সবুজ পতাকা, ব্যানার ও আলোকসজ্জায় সাজানো হয় বিভিন্ন এলাকা।

এ উপলক্ষে বড় জনসমাবেশ, ধর্মীয় আলোচনা এবং নবীজি (স.)-এর প্রশংসায় কবিতা ও কাসিদা পাঠের আয়োজনও দেখা যায়। রাজধানী সানায় মাওলিদকে ঘিরে বড় জনসমাগমের ছবি বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

Mawlid_al-Nabi
ইয়েমেন

 

একই উপলক্ষ, ভিন্ন সংস্কৃতি

মরক্কোর মোমবাতির শোভাযাত্রা, মিসরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, তুরস্কের ‘মেভলিদ কান্দিলি’, তিউনিসিয়ার ‘আসিদাত জগুগু’, ইন্দোনেশিয়ার ‘গুনুঙ্গান’, পাকিস্তানের আলোকসজ্জা, সেনেগালের ‘গামু’, সোমালিয়ার মিছিল, ইরাকের ধর্মীয় আয়োজন, কাশ্মীরের হজরতবাল কিংবা ইয়েমেনের সবুজ সাজসজ্জা—মাওলিদকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের আয়োজনের বৈচিত্র্য এতে স্পষ্ট হয়।

একই উপলক্ষ কোথাও শোভাযাত্রা, কোথাও ধর্মীয় সমাবেশ, কোথাও আলোকসজ্জা, আবার কোথাও খাবার ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে সামাজিক রূপ পেয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাব এসব আয়োজনকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

তবে মাওলিদ পালন নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ এটিকে নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও সীরাত স্মরণের উপলক্ষ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এর প্রচলিত আয়োজনকে শরিয়তসম্মত মনে করেন না। তাই বিভিন্ন দেশের এসব আয়োজনকে সেখানকার প্রচলিত রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে দেখা উচিত, ইসলামের সর্বসম্মত ধর্মীয় বিধান হিসেবে নয়।

ভৌগোলিক দূরত্ব ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য সত্ত্বেও নবীজি (স.)-এর জীবন ও স্মরণ বিভিন্ন সমাজে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতে প্রকাশ পেয়েছে। মাওলিদকে ঘিরে বিশ্বের নানা প্রান্তের এই আয়োজনগুলো সেই বৈচিত্র্যেরই একটি চিত্র।

সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর