সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ইরান যুদ্ধের ৬ মাস: কোন দেশে জ্বালানি তেলের দাম কতটা বাড়ল?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ইরান যুদ্ধের ৬ মাস: কোন দেশে জ্বালানি তেলের দাম কতটা বাড়ল?

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা দেখতে দেখতে ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকেই বদলে দেয়নি, বরং সরাসরি ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। 

বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মূল্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘গ্লোবালপেট্রোলপ্রাইসেস’-এর ১৭০টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।

কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের অন্তত ১৪৫টি দেশে পেট্রোল ও জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাকি ২৫টি দেশ— যেগুলোর অধিকাংশই তেল উৎপাদনকারী বা জ্বালানিতে ব্যাপক ভর্তুকি দিয়ে দাম অপরিবর্তিত রেখেছে।  

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বেশি পেট্রোলের দাম বেড়েছে মিয়ানমারে, যা ২৩ ফেব্রুয়ারির প্রতি লিটার ০.৭৭ ডলার থেকে ১৭ আগস্টে ১.২০ ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পরেই রয়েছে ভুটান, যেখানে দাম ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। এরপরে রয়েছে কিউবা ৫১ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৫০ শতাংশ এবং নাইজেরিয়া ৪৮ শতাংশ।

আল জাজিরার তথ্যমতে, জ্বালানীর তেলের দাম বাড়ানোর তালিকায় ৬৬তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত ২৩ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশে প্রতি লিটার পেট্রোল ০.৯৮ ডলার থেকে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৭ আগস্টে ১.১৮ ডলারে পৌঁছেছে। 

image

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত দুই দফায় দাম বাড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ১১৬ টাকা, বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায় (অকটেন ১৪৫ টাকা)।

সেই হিসাবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে প্রতি লিটার পেট্রোলে খরচ বেড়েছে ২৪ টাকা (প্রায় ২১.৮ শতাংশ)। অর্থাৎ, আগে কেউ যদি প্রতি মাসে ৫০ লিটার পেট্রোল ব্যবহার করতেন, তবে এখন তার মাসিক খরচ ১,২০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে এশিয়ার দেশগুলো মধ্যে দাম বাড়ানোর তালিকায় ৩৩তম স্থানে আছে পাকিস্তান। যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত দেমটির পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২৯.২৫ শতাংশ। বিপরীতে ভারত আছে ১৪১ নম্বরে, দেশটি এখন পর্যন্ত পেট্রোলের দাম বেড়েছে মাত্র ১.৮৯ শতাংশ।  

অন্যদিকে আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন (৩.৭৮ লিটার) সাধারণ পেট্রোলের জাতীয় গড় মূল্য ছিল ২.৯৪ ডলার এবং গত ৬ মাসে সেই দাম ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪.০৯ ডলারে দাড়িয়েছে। 

আলজাজিরা বলছে, জ্বালানি তেলের এই বিশ্বব্যাপী ঊর্ধ্বগতি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে, যার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারেও জ্বালানির দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে।  এর ফলে বাস, ট্রাক এবং লঞ্চসহ সব ধরনের গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। 

আল জাজিরার মডেলে দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সমপরিমাণ অর্থে আগের চেয়ে ২৫ শতাংশ কম পথ চলা যাচ্ছে, ঠিক তেমনি এশিয়ার সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের খরচ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেল হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির জীবনশক্তি। বাংলাদেশের মতো কৃষি উৎপাদন দেশগুলোর—বিশেষ করে সেচ পাম্প চালানো এবং সার উৎপাদনের জন্য জ্বালানি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। পরিবহনের উচ্চ খরচ এবং সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাল, ডাল ও সবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বহুগুণ বেড়েছে, যা সরাসরি বাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উস্কে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এখন জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং বিকল্প বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই।

সূত্র: আলজাজিরা

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর