যুদ্ধের ময়দানে যখন রাশিয়ার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন, তখন দেশের রাজনীতিতেও তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। যুদ্ধের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের দাবি উঠলেও তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর আশঙ্কা, এই সময়ে নির্বাচন হলে তা দেশকে আরও বিভক্ত করে দিতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
কিয়েভে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলার সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা হলে তা রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
জেলেনস্কির এই বক্তব্য আসে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের নির্বাচন আয়োজনের দাবির পর। ফেদোরভ সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় যুদ্ধের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরকারের সমালোচনা করেন।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর পর ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি রয়েছে। এর আওতায় দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও ইউক্রেনের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ, দেশটির অনেক এলাকা এখনো রাশিয়ার দখলে। লাখো ইউক্রেনীয় নাগরিক যুদ্ধের কারণে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। পাশাপাশি সম্মুখসারিতে থাকা সেনাদের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করাও বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি তো রয়েছেই।
ফেদোরভের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব অবশ্য তাঁর সব সমর্থকের কাছ থেকেও সমর্থন পায়নি। তাঁর পক্ষে যুদ্ধকালীন সময়ে রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজনও পরে নির্বাচন আয়োজনের ধারণার বিরোধিতা করেছেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি জরিপেও যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে নির্বাচন না চাওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ইউক্রেনের ৫৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, শান্তিচুক্তি এবং যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পরই নির্বাচন হওয়া উচিত।
এদিকে ফেদোরভকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও ইউক্রেনের রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি বন্ধের উদ্যোগ এবং সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তাঁকে সরানো হয়েছে বলে ফেদোরভ দাবি করেন। পরে দেশটির পার্লামেন্ট নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ইয়েভহেনি খমারাকে অনুমোদন দেয়।
তবে শুধু নির্বাচন ইস্যুই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির অভিযোগও জেলেনস্কি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। দেশটির দুর্নীতিবিরোধী কর্তৃপক্ষ একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে। ওই ঘটনায় জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট তাঁর একজন শীর্ষ সহযোগীকে বরখাস্ত করেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি যুদ্ধের মাঠেও পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন দুই পক্ষই সাম্প্রতিক সময়ে সম্মুখসারির বাইরে অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ক্রিভি রিহ-তে রুশ ড্রোন হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন জেলেনস্কি।
শীত মৌসুমকে সামনে রেখে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহৃত মার্কিন তৈরি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইউক্রেনের আরও শত শত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন। তিনি বলেন, অস্ত্রের ঘাটতি এবং যুদ্ধের অর্থায়ন বর্তমানে ইউক্রেনের দুটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে যুদ্ধের পাশাপাশি দূরপাল্লার হামলা বন্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের কথাও জানিয়েছেন জেলেনস্কি। কৃষিপণ্য বহনকারী জাহাজসহ কৃষ্ণসাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা না চালানোর বিষয়ে একটি সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইউক্রেনের শহরগুলোতে রুশ হামলা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন।
সুত্র:আল-জাজিরা




